Tuesday, মে ২১, ২০২৪

করোনা, নজরুল ও আমাদের জীবন

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

রেজাউল করিম শেখ

এক.
আমার ক্ষয়িষ্ণু জীবনের বর্ধিষ্ণু সময় অতিবাহিত হচ্ছে মগ্নতায় কিংবা কিছু শব্দের-বাক্যের ব্যয়ে। এরকম বন্দি জীবন আমার মাঝে মাঝে খুবই ভালো লাগে। খুব শান্তির মনে করি। তবে সত্যিই এখন আর ঘুমাতে ইচ্ছে করে না। ভেতরে ঘুমের নদী সর্বদা গর্জনের আওয়াজ শুনতে চায়। কিন্তু কি এক অদ্ভুত মায়া এসে গেছে প্রাণের- বাধ্য হয়েই ঘুমিয়ে যাই। এই আশ্চর্য এক বোধের ভেতর এখন অনন্ত ঘুমের দেশের একটি ছবি আঁকি। সেখানে সত্যিই কিছু কাশবন থাকুক, কিছু ঘাসফুল থাকুক, কয়েকটা টিয়ে পাখি, কয়েকটা মাছরাঙা, কয়েকটা দোয়েল ও শালিক উড়ুক- একটা লাল সূর্য আলো দিক।
এই যে আমি এইখানে- নপম-এ বসে আছি, অনেকেই জানে না। করোনা ভীতির সময়ে রাত্রিদিন একত্রিত করে এই এক জগতে নিমগ্ন থাকি- সত্যিই অনেকেই জানে না। তবুও তো আমি এখানেই আছি। এবং আছি একথা সকলের জানার কথাও নয়- দরকারও নেই। তেমনি সৃষ্টিকর্তাও আছেন-তাঁর মতো করে, তাঁর একান্ত নিজের জগতে। আমাদের জানার বা দরকারের বাইরে- আপন ধ্যানে। অনুধ্যানে হয়তো আমরা তাঁকেই খুঁজি, হয়তো তাঁর ছলে নিজের ভেতরেই হেঁটে চলি। যেখানে সমুদ্র আছে, উপত্যকা আছে। দৃষ্টির সীমানায় অসীম শূন্যতার প্রকাশ আছে। একথা মানতে হবে যে, আমাদের কারো দেখা না দেখায় তাঁর অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ নয়। ঠিক- আমাদের ঘুমিয়ে থাকার মতো, ঠিক করোনার বন্দিদিনে আমাদের লুকিয়ে থাকার মতো। এ-তো লুকিয়ে থাকাই নয় কেবল পালিয়ে থাকা- পালিয়ে বেড়ানো।
বাঙালির কবি, কুমারীর কবি, ষোড়শীর কবি, বিধবার কবি, চির-গৃহহারা পথবাসীর কবি, অবমানিতের কবি, যৌবন-ভীতু পল্লীমেয়ের কবি কাজী নজরুল ইসলামও আছেন। আছেন আমাদের জীবন ও জগতের আলো-অন্ধকারের সেতুবন্ধ হয়ে। কখনো তাঁকে আমরা আবিষ্কার করতে পারি, কখনো পারি না। আবিষ্কার-অনাবিষ্কারের মাঝে তিনি সন্তর্পণে থেকে যান ভালোবাসা ও প্রেম নিয়ে- আমাদের যাপিত জীবনের খুব গভীরে। নৈরাষ্ট্রিক, অনৈতিক চিন্তাবাদ ও লুটপাটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মুখোর মানুষের আত্মার অন্তর-বীজ হয়ে জীবিত নজরুল মরণের শূন্যতাকে অতিক্রম করে ঘর বেঁধেছেন শান্তি আর সাম্যের পথে বিপ্লব আর বিদ্রোহের পথে। লোক দেখানো ফাঁপা প্রচারে তাঁর জৌলুস একটুও কমেনি।
প্রশংসা আপনি কাকে করবেন, কেন করবেন? এ প্রশ্নের সদুত্তর কে খুঁজতে যায়- কখন? মরা মানুষের ভালোবাসা সবাই দিতে জানে, জীবিত- প্রাণ ঐশ্বর্যে ভরপুর একজন নৈতিক মানুষের প্রতি সদাশয় আচরণ কেউ পূর্ণতায় আনতে পারে না। আমরা কেউ পারি না। একজন পূর্ণ মানুষের যে বিশাল বিমুগ্ধ দৃষ্টি অনেক অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত- অনেক অনেক কাল পর্যন্ত প্রসারিত তা আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না, বিধায় তাকে ভুল ভাবে পরিমাপ করি আর ভুল ভালোবাসায় বিপর্যস্ত করি। আমাদের পরিবারগুলো এরকম বিপণ্নতার রোগে ভোগা পেট খারাপ হওয়া মুরগীর মতো হয়ে আছে। এখানে বৃহৎ সত্তার বড় মানুষ জন্ম নেওয়ার ও বেড়ে ওঠার প্রতিকূল পরিবেশ নেই। যা আছে অতি সাধারণ আর অনৈতিক মানুষের কারাগার।
তাই আমাদের স্বপ্নগুলো প্রতিদিন বেচে দিতে হয়। বেচে দিতে হয় আমাদের প্রতিটি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ যৌবন। তারা কিছু রক্ত ও মাংশের ভাগাড় হয়ে বেড়ে ওঠে। আর জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে পায় কেবল প্রাগৈতিহাসিক চিন্তাস্রোতের লিঙ্গচেতনা। সত্যিই তো আমাদের জীবন কিছুকাল সংঘর্ষের আর কিছুকাল অভাবে, অগোচরে, অবচেতনে রক্তের অছ্যূত- অনাহূত সংশ্লেষের। এভাবে পুনরুৎপাদনের লীলায় আমরা স্বপ্নের নীলিমা ভেসে যায়।

দুই.
কাজী নজরুল ইসলাম, কবি। তিনি তো মানুষ ছিলেন, কী এক মহাসন্ধিক্ষণে পৃথিবীর বুকে এক তারার জগতের আলো নিয়ে এসেছিলেন। কী উদ্দামতা, কী মহান উদ্দোম! যে অবলীলায় শাসকের- শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বলে দিতে পারলেন- ‘এ দেশ ছাড়বি কি না বল, নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল’।
মানুষ না হলে কি তিনি বলতে পারতেন- ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্’। একদিকে তাঁর পীঠে ব্যথার চাবুক আরেকদিকে অন্তরে দূর্নিবার মুক্তির বাসনা নিয়ে হস্ত-পদ-মস্তকে তুলে এনেছেন মানবের অসীম মুক্তির আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের বাতি বিলাস।
মানুষের কবি, মানুষ কবি নজরুল মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করলেন সত্যিকারের মানুষের মতো করে-
ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হ’তে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চণ্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী-পাঠ।’
এই মানুষের বিচিত্র বিস্ময়ের পাদপীঠে তিনি আরো গভীর ও ব্যঞ্জনারধ্বনি আনলেন পরক্ষণে-
‘চাষা ব’লে কর ঘৃণা!
দে’খো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী- যা আছে র’বে চিরকাল।’
করোনার এ ভীতিরেকালে যখন আমাদের যন্ত্র সভ্যতা বিকির্ণ করছে প্রতিদিন আমাদের মৃত্যুর-ধ্বংসের আলোকরশ্মি, তখন রাখালের-কৃষকের লাঙলে মর্মরিত হয় বেঁচে থাকার আস্বাদ। নজরুল আমাদের ভুবনে এরকমই এক তারার আলো হয়ে জ্বলছে- জ্বলবে।
নজরুল পাঠে আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রতিদিনের স্বপ্ন-সাধ-আহ্লাদ পূরণের শক্তি দূর্নিবার করে তোলে। আমরা ঝরের বিরুদ্ধে অসীম প্রতাপে দেয়াল গড়ে তুলি- দাঁড়িয়ে যাই, এক অনাবিল শান্তির জন্য। আমাদের হেরে যাওয়া ঠেকে যায়- দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীরে এসে।

তিন.
এই যে, যারা এখন আজ কবির জন্মদিনে হরদম শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, তাদের জীবনে নজরুল ক্ষয় হয়েই আছে দেখছি। জীবনে যারা কোনোদিন সত্য আর মিথ্যার পার্থক্যের কালে নিরপেক্ষ ছাড়া কোনো বিকল্প অবস্থান কল্পনা করতে পারেনি। কোনোদিন কোনোকালে যারা নজরুলের জীবন্ত সত্তার সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারেননি, তারাও তো দেদারসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন- এতে ঈশ্বর, নজরুল বা আমরা হেসে ওঠা ছাড়া আর কী বলে যেতে পারি! তবে সত্যিকার অর্থেই এ সমাজের জন্য অশনী সংকেত- বিশৃঙ্খলার এক চরম দৈন্য আর চুড়ান্ত রূপের প্রকাশ। এদের প্রশংসার চাটু বাক্য হতে সাবধান থাকা আর শয়তানের কারাপ্রাচীর ডিঙানো কষ্টকর হলেও, সর্বাত্মক সচেষ্ট থাকা একান্ত জরুরী, প্রধানতম- সুন্দতম বিপ্লব।
(চলবে…)

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর