Monday, মে ২০, ২০২৪
শিরোনাম

বিশ্ব ডিম দিবস : ‘আন্ডা’ কিংবা ‘অশ্বডিম্ব’নামা

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

আবদুল্লাহ আল মোহন

১. এ বিশ্বে দিবসের কোনো শেষ নেই। ডিম নিয়েও আছে একটি দিবস। আজ সেই দিন, আজ ‘বিশ্ব ডিম দিবস’। ডিম প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ডিমের গুরুত্ব দিন দিনই বাড়ছে। ফলে ভোক্তাদের মধ্যে ডিম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছরের মতো আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিদিনই ডিম খাই, রোগ-প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়াই’ সামনে রেখে বিশ্ব ডিম দিবস উদযাপন করা হচ্ছে দেশে-বিদেশেও। গতবারের প্রতিপাদ্য ছিলো- ‘সুস্থ মেধাবী জাতি চাই, প্রতিদিন ডিম খাই’। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় প্রথম ‘বিশ্ব ডিম দিবস’ পালনের আয়োজন করে, যা পরবর্তী সময়ে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্য দেশের মত আমাদের বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। দেশের পোলট্রি খাতের সংগঠনগুলোর সম্মিলিত জোট বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি পালন করছে দিবসটি। ‘সুস্থ সবল জাতি চাই-সব বয়সে ডিম খাই’ এই প্রতিপাদ্যে ২০১৮ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিত হয় বিশ্ব ডিম দিবস।ডিমপ্রেমী সবাইকে জানাই বিশ্ব ডিম দিবসের কুসুম কুসুম শুভেচ্ছা, পুষ্টিকর ভালোবাসা। ‘অশ্বডিম্ব’ পছন্দ নয় যাদের, আমার মতোন তাদের নিশ্চয়ই প্রিয় খাদ্য হাফবয়েল ডিম। যদিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনে অধিকাংশ সময়ই বাধ্যতামূলক ডিম-রুটির খাওয়ার কারণে চরম অভক্তি চলে আসে ডিম-রুটির প্রতি। ডিমের প্রতি সেই নিরাসক্তি অবশ্য ডিমের পুষ্টির কারণেই, খাওয়ার মোহের জন্যেই কেটে গেছে। আর তাইতো ডিম দিবসে ডিম বন্দনায় নেমেছি।২.ডিম দিবসের ইতিহাসে জানতে পারি, ১৯৬৪ সালে ডিমকে বিশ্বে একটি উন্নতমানের ও সহজলভ্য আমিষজাতীয় খাদ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন (আইইসি) স্থাপিত হয় । বর্তমানে এই সংস্থার সদস্যসংখ্যা ৮০। সংস্থাটির উদ্যোগে প্রাণিজ আমিষের চাহদা পূরণ, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠন এবং সর্বোপরি ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত প্রভৃতি দেশসহ সারা বিশ্বের ৪০টি দেশে পালিত হয় ‘বিশ্ব ডিম দিবস’, যার পরিধি ও ব্যাপ্তি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে বর্তমানে বিশ্বে পালিত হয় ‘বিশ্ব ডিম দিবস’। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বছরে একজন মানুষের ন্যূনতম ১০৪টি ডিম খাওয়া উচিত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব পোলট্রি সায়েন্সের অধ্যাপক ড. ইলিয়াস হোসেন বলেন, প্রতিদিন একজন মানুষকে অন্তত একটি করে ডিম খাওয়া উচিত।৩.বাংলাদেশে ২০১৩ সাল থেকে প্রথমবারের মতো ‘বিশ্ব ডিম দিবস’ পালন করা হয়। সেটি ছিল ১৮তম বিশ্ব ডিম দিবস। সেই থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশে বিশ্ব ডিম দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে। উল্লেখৗ, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ অ্যানিমেল অ্যাগ্রিকালচার সোসাইটি (বিএএএস) ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হয়। দিবসটির গুরুত্ব অনুধাবন করে ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন ও এফএওর তত্ত্বাবধানে এবং সহযোগিতায় সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান , বাংলাদেশ অ্যানিমেল অ্যাগ্রিকালচার সোসাইটিসহ অনেক সংগঠনের উদ্যোগে ঢাকাসহ সবগুলো বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে উৎসাহের সঙ্গে দিবসটি নিয়মিত পালন করে আসছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উদযাপন করতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এ বছর ডিম দিবসে দরিদ্রদের মাঝে বিনামূল্যে সেদ্ধ ডিম বিতরণ করা হবে। ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন- বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি), বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতর দিবসটি যৌথভাবে উদযাপন করতে এসব উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকাসহ সবগুলো বিভাগীয় শহরে র‌্যালি এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। জেলা শহরগুলোতেও সুবিধা বঞ্চিত ও এতিম শিশুদের মাঝে বিনামূল্যে সেদ্ধ ডিম বিতরণ করা হবে।৪.সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। চীনে নয় বছর ধরে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সী প্রায় ৫ লাখ মানুষের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। সম্প্রতি ব্রিটিশ ‘জার্নাল হার্টে’ ওই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, প্রতিদিন ডিম খেলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি ১৮ শতাংশ এবং স্ট্রোকে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ২৮ শতাংশ কমে যায়। আজকাল প্রায় সব চিকিৎসকই স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় প্রতিদিন ডিম রাখতে বলেন। কারণ এতে প্রচুর প্রোটিন, ভিটামিন এ,ডি,বি এবং বি ১২ আছে। এছাড়া ডিমে থাকা পুষ্টি উপাদান চোখের ক্ষতি রোধ করে। দিনে কতগুলি ডিম খাওয়া যায় এ নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। এ ব্যাপারে ব্রিটিশ ডায়েটিক অ্যাসোসিয়েশনের চিকিৎসক ডা. ফ্রাঙ্কি ফিলিপ বলেন, প্রতিদিন একটা বা দুটি ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ডিমে কোলেষ্টেরল থাকায় এটি হৃদরোগের জন্য ক্ষতিকর- এমন অনেক কথা প্রচলিত আছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিমে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও ভিটামিন থাকায় এটি হৃদরোগের জন্য উপকারী। গবেষকরা বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে, সহনীয় মাত্রায় অর্থাৎ প্রতিদিন একটি বা দুটি করে ডিম খেলে তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া ডিমে প্রোটিন এবং নয় ধরনের প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড রয়েছে। সেই সঙ্গে এতে লুটেইন নামের এক ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে; যা বয়সকালে মস্তিষ্ক ভালো রাখে। (সূত্র : বিবিসি ও হিন্দুস্তান টাইমস)৫.প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় ডিম থাকে না এমন মানুষ মেলা ভার। তবে আমিষ ভেবে অনেকেই ডিম থেকে দূরে থাকেন। কারণ,ডিম মুরগির শরীর থেকে তৈরি হয়। আর মুরগি জীবন্ত জিনিস। এই যুক্তিতেই একাংশের মত ডিম আমিষ। তবে পালটা যুক্তিও রয়েছে। তবে বিস্তর গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন ডিম মোটেও আমিষ নয়,বরং নিরামিষ। তাদের যুক্তি,ডিমের ৩টি অংশ। ডিমের খোসা,কুসুম এবং সাদা অংশ। সাদা অংশ শুধুমাত্র প্রোটিন দিয়ে তৈরি। আর কুসুমে রয়েছে প্রোটিন ও কোলেস্টেরল। বাজারে খাওয়ার জন্য যে ডিম বিক্রি হয় তা অনিষিক্ত। তার মধ্যে কোনও ভ্রুণ থাকে না। তাদের সিদ্ধান্ত, ডিম খেলে যেহেতু জীবহত্যার দায়ে দুষ্ট হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই ডিম নিরামিষ খাবার। (সূত্র: জিনিউজ)৬.জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষকে বছরে গড়ে ১১০টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। তবে বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটি বলছে, দেশের মানুষ বছরে ডিম খায় গড়ে মাত্র ৫০ থেকে ৫৫টি। দরিদ্রদের মধ্যে এ হার ১০ থেকে ১৫টির মধ্যে আটকে থাকে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ বছরে জনপ্রতি গড়ে ২৭০টি ডিম পেটে চালান করেন। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে দৈনিক ডিমের চাহিদা দুই কোটি ৭০ লাখ। বর্তমানে প্রতিদিন ডিম উৎপাদন হচ্ছে তিন কোটি পিস। ডিম উৎপাদনে দেশে কোনো ঘাটতি নেই। তবে ২০২১ সালে প্রতিদিন ডিমের দরকার হবে ৪৫ কোটি পিস। খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ সালে মুরগির ডিমে কৃত্রিমভাবে তা দেওয়ার পদ্ধতি আবিস্কার করে মিসরীয়রা। অনেকেই বলেন, মুরগির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ডিমের রঙ হয়। সাদা মুরগির ডিম সাদা হয়। বাদামি ও লাল মুরগির ডিম বাদামি রঙের। তবে সব মুরগির ক্ষেত্রে এ নিয়ম ধরাবাঁধা নয়, ব্যতিক্রমও আছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিমের রেকর্ড এখন জার্মানির দখলে। ২০১৬ সালে জার্মানির ভস্টেনবুটেল শহরের একটি মুরগি ২০৯ গ্রামের বড় ডিম পেড়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। এর আগে এ রেকর্ড ছিল ব্রিটিশদের দখলে। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্যের এসেক্সের একটি মুরগি ৯ দশমিক ১ ইঞ্চি পরিধির একটি ডিম পাড়ে। বিশ্বে ৪০ শতাংশ ডিমের জোগান দেয় চীন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। চীন সব নকল করতে পারে। এ ধারণা থেকে অনেকে অভিযোগ করছেন, চীন নকল ডিম বাজারে ছেড়েছে। তবে চীন থেকে ডিম আমদানি করে না বাংলাদেশ। তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ অন্যান্য মাধ্যমে নকল ডিমের ছবি দেখিয়ে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজারে ঢুকছে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি কৃত্রিম নকল ডিম। এমন অপপ্রচারে বাঙালির পাত থেকে প্রোটিনের অন্যতম উপাদান ডিম উধাও হওয়ার জোগাড়। এরই মধ্যে অনেকে শিশুদের ডিম খাওয়ানো বন্ধও করে দিয়েছেন। নকল ও কৃত্রিম ডিম বাজারে সয়লাব হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এ নিয়ে গবেষণা শুরু করে। তাদের গবেষণায় ডিম নকল হওয়ার তথ্য মেলেনি। নারায়ণগঞ্জ সদরের ইমাম পোলট্রির ম্যানেজার রায়হান আলম বলেন, খামারে হাঁস-মুরগি সব সময় একই রকমের মসৃণ ডিম দেয় না। অনেক সময় ডিম আঁকাবাঁকা ও বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। এগুলোকে নকল বা প্লাস্টিকের ডিম মনে করে অনেকে ভীতি ছড়াচ্ছেন- এটা ঠিক নয়। বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মহসিন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রচারণা থেকেই নকল ডিমের গুজব ছড়িয়েছে। আসলে নকল ডিমের কোনো অস্তিত্ব এ দেশে নেই। বাংলাদেশ পোলট্রি শিল্প সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক মশিউর রহমান বলেন, একটি সুস্থ-স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনে ডিম খাওয়া বাড়াতে হবে। দুই থেকে তিন বছর আগে একটি ডিমের দাম ছিল ১২ টাকা। এখন সাত থেকে আট টাকায় নেমে এসেছে। সরকার পোলট্রি শিল্প খাতে বিশেষ প্রণোদনা ও ভ্যাটমুক্ত করলে ডিমের দাম আরও কমানো সম্ভব। ৭.ডিমের পুষ্টিগুণ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাজমা শাহীন সমকালকে বলেন, ডিম দেহের পুষ্টিগুণ বাড়াতে ও দীর্ঘায়ু হতে সাহায্য করে। রক্তে কোলেস্টেরল জমতে বাধা দেয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। মস্তিস্কের কার্যকারিতা ঠিক রাখে। চোখ ও হাড় ভালো রাখে, প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করে। ডিমের সবচেয়ে বড় গুণ, এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। সকালের নাশতায় প্রতিদিন একটি ডিম মানে সারাদিন ক্ষুধা কম হবে। বারডেম হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ডা. রফিকুল ইসলাম রনক বলেন, ডিমে আছে ভিটামিন ‘এ’। এটি দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে। শুধু ডিমেই রয়েছে ভিটামিন ‘ডি’, যা পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। গর্ভবতী মায়েদের প্রতিদিন একটি অথবা দুটি ডিম খাওয়া উচিত। তাহলে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হয় না। শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ডিম প্রয়োজন। যেসব নারী সপ্তাহে কমপক্ষে ছয়টি ডিম খান, তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ কম। ৮.ডিমের কুসুম সিগারেটের থেকেও বেশি ক্ষতিকারক! ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট টেবিলে সেদ্ধ ডিম থাকবে না! এটা হয় নাকি? কানাডার ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, ধূমপান করার থেকেও প্রতিদিন ডিম খাওয়া আরও বেশি স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী ১২০০ জন নারী, পুরুষকে নিয়ে সমীক্ষা করেন। দেখা গেছে অতিরিক্ত সেদ্ধ ডিম খাওয়াতে তাঁদের শরীরে ক্যারোটিড আর্টারি স্টেনোসিস তৈরি হয়েছে। এতে ব্রেন স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভবনা থাকে বেশি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোশিয়েসনের কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক জর্ডন তোমাসেলি জানান, অতিরিক্ত ডিম খাওয়ার পর ক্যারোটিড প্লেক যতটা তৈরি হয় ধূমপান করলেও সেই পরিমাণ প্লেক তৈরি হয় ধমনীতে। এতে রক্তচাপ বাড়ে। এমন কী ফুসফুসে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এতকিছু শোনার পরও কিন্তু ব্রেকফাস্ট টেবিলে সেদ্ধ ডিম চাই। তাহলে কী ভাবে খাবেন সেদ্ধ ডিম? তার সমাধানও বাতলে দিয়েছেন চিকিৎসক জর্ডন তোমাসেলি। প্রতিদিন আমাদের শরীরে ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয় সেখানে একটি সেদ্ধ ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকে ১৮৫ মিলিগ্রাম। সেদ্ধ ডিম ছাড়াও সারাদিন আমরা কোলেস্টেরল, প্রোটিন জাতীয় খাদ্য খেয়ে থাকি। এতে প্রতিদিনই ৩০০ মিলিগ্রামের বেশি কোলেস্টেরল জমা হয়। তাই জর্ডনের পরামর্শ ডিমের কুসুমের বাদ দিয়ে সাদা অংশ যদি খাওয়া যায়, তাহলে শরীরে পরিমাণ মতো কোলেস্টেরল, ভিটামিন ই পৌঁছবে। মদ্দা কথা, অতিরিক্ত ডিমের কুসুম খাওয়াতে শরীরে কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। ( দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ জুন, ২০১৬)৯.শেষের আগে বিশ্ব ডিম দিবসে ডিমের ১২ পুষ্টিগুণ জানা যেতে পারে। ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে আজকাল অনেকেই ডিম খান না। আবার কেউ রক্তে চর্বির পরিমাণ কম রাখতে কিংবা হৃদরোগের ভয়ে ডিমের কাছেই যান না। কেউ আবার শুধু সাদা অংশ খেয়ে কুসুম ফেলে দেন। ২০০৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছে এডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তী কালে সপ্তাহে ৬টি করে ডিম নিয়মিত খেলে প্রায় ৪৪ শতাংশ ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। ওই সমীক্ষায় এটাও জানানো হয়েছে, ডিম হৃৎপিন্ডেন রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। ফলে স্ট্রোক বা হার্ট এটাক হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই কম থাকে। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এমন একটি প্রাকৃতিক খাবার নিয়ে নানা ধরণের বিভ্রান্তি কাটাতে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের ন্যায় দেশে আজ বিশ্ব ডিম দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হলো- সুস্থ সবল জাতি চাই, সব বয়সে ডিম খাই। ডিমের গুণাগুণ নিয়েেএকজন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, সকালে নাস্তায় একটি ডিম মাসে প্রায় ৩ পাউ- পর্যন্ত ওজন কমাতে পারে। ডিমের ১২টি উপকারিতার কথা এ পর্যন্ত জানা গেছে। যেমন : ছোট একটি ডিম হাজারো ভিটামিনে ভরা। এর ভিটামিন বি ১২ খাবারকে এনার্জি বা শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করে। ২) ডিমের মধ্যে আছে ভিটামিন এ। যা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। ডিমের কেরোটিনয়েড, ল্যুটেন ও জিয়েক্সেনথিন বয়সকালের চোখের অসুখ ম্যাকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। এই একই উপাদান চোখের ছানি কমাতেও সাহায্য করে। ৩) কেবলমাত্র ডিমেই রয়েছে ভিটামিন ডি। যা পেশীর ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। ৪) ডিমে আছে ভিটামিন ই। এটি কোষ এবং ত্বকে উৎপন্ন ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নষ্ট করে দেয় এবং স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। ৫) ডিমের সবচেয়ে বড় গুণ এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। ব্রেকফাস্টে রোজ একটি ডিম মানে সারাদিন ক্ষুধা কম হবে, খাওয়া হবে কম। গবেষণায় দেখা যায় শরীর থেকে দিনে প্রায় ৪০০ ক্যালোরি কমাতে পারে সকালে একটি ডিম খাওয়া। তার মানে মাসে ওজন কমার পরিমাণ প্রায় তিন পাউন্ড। সমীক্ষা বলছে, ৬৫% বডি ওয়েট, ১৬% বডি ফ্যাট, ৩৪% কোমরে জমে থাকা মেদের পরিমাণ কমাতে পারে ডিম! ৬) ডিমে আছে আয়রণ, জিঙ্ক, ফসফরাস। শরীর তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ডিমের মধ্যে থাকা আয়রন এই ঘাটতি মেটাতে পারে সহজেই। জিঙ্ক শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। আর ফসফরাস হাড় ও দাঁত মজবুত করে। ৭) প্রত্যেক নারীর শরীরে রোজ কমপক্ষে ৫০ গ্রাম প্রোটিনের দরকার। একটি ডিমে থাকে ৭০-৮৫ ক্যালোরি বা ৬.৫ গ্রাম প্রোটিন। সুতরাং চাঙা থাকতে রোজ ডিম খেতেই পারেন। ৮) এডোলেশন পিরিয়ডে বা পরবর্তীকালে সপ্তাহে ৬টি করে ডিম নিয়মিত খেলে ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডিম হৃৎপিন্ডের রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। ফলে স্ট্রোক বা হার্ট এটাক হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকটাই কম থাকে। ৯) শরীর সুস্থ রাখার আরও একটি জরুরি উপাদান কোলাইন। কোলাইনের ঘাটতি ঘটলে অনেক সময় কার্ডিওভাসকুলার, লিভারের অসুখ বা নিউরোলজিক্যাল ডিজ-অর্ডার দেখা দিতে পারে। একটি ডিমে প্রায় ৩০০ মাইক্রোগ্রাম কোলাইন থাকে। যা কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম, স্নায়ু, যকৃৎ ও মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণে রাখে। ১০) নতুন সমীক্ষা জানা গেছে, ডিম কোলেস্টেরল বাড়ায় না। দিনে দুটো ডিম শরীরের লিপিড প্রোফাইলে কোনও প্রভাব ফেলে না। বরং ডিম রক্তে লোহিতকণিকা তৈরি করে। ১১) প্রোটিন শরীর গঠন করে। আর প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে অ্যামিনো এসিড। একুশ ধরনের এমিনো এসিড এই কাজে প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমাদের শরীর অতি প্রয়োজনীয় নয়টি এমিনো এসিড তৈরি করতে পারে না। তার জন্য আমাদের প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট নিতে হয়। খাবারের মধ্যে এই প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট হল ডিম। যা ঝটপট শরীরে প্রোটিন উৎপাদন করতে পারে। ১২) নখ ভেঙে যাচ্ছে চটপট? নাকি চুলের স্বাস্থ্য একেবারেই বেহাল? চোখ বন্ধ করে রোজ ডিম খেয়ে যান। ডিমের মধ্যে থাকা সালফার ম্যাজিকের মতো নখ আর চুলের মান উন্নত করবে।১০.এবার ডিম নিয়ে কিছু (অ)প্রিয় কথা শোনা যাক।- ডিম আগে নাকি মুরগী আগে?এ নিয়ে একটা প্যাচ সময়ই লেগে থাকে ।- ডিম শুধু খাওয়াই হয় না, ডিম ছুড়ে মারা কাজে ব্যবহৃত হয়। সেখানে পচা ডিম অগ্রাধিকার পায় ।- এছাড়া পুলিশি রিমান্ডে ডিম থেরাপী দিতে ডিমের ব্যবহার অনস্বীকার্য বলেই অভিজ্ঞজনদের ধারণা।- ডিম নিয়ে আমাদের দেশে বেশ ভালো রকমে একটা কুসংস্কার আছে, ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি, ডিম খেলে নাকি পরিক্ষায় ডিম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই কুসংস্কার এর জন্য অনেকে ডিম খান না পরিক্ষার আগে। অবশ্যই আমার মতোন অনেকেই অনেকবার খাননি নিশ্চয় ! সর্বশেষ, বাংলাদেশে মেস, হোস্টেল ব্যাচেলরদের বাচিয়ে রাখার জন্য ডিমের অবদান লিখে শেষ করা যাবে না। সবশেষে ডিমখোরদের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করে, ‘বাঙালি হবে স্বাস্থ্যবান, প্রতিদিন ডিম খান’ বাণীতে আস্থা রেখে আবারো সবাইকে জানাই বিশ্ব ডিম ওরফে ‘আন্ডা’ দিবসের শুভেচ্ছা।১১.ইউজিসি অধ্যাপক ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর কাছ থেকে জানা যাক ডিম খাওয়া- না খাওয়ার বিষয় নিয়ে। ‘ডিম খেতে নেই মানা’ প্রবন্ধে তিনি জানাচ্ছেন, ‘করোনাকালে মানুষের মনে সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে তা হচ্ছে ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, তারা এ অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণেও টিকে যাচ্ছেন আর যাদের কম তাদের বেশ ভোগান্তি হচ্ছে, অনেকে মারাও যাচ্ছেন। তুলনামূলক কম বয়স্ক, যারা নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করেন এবং সুষম খাদ্য খান তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। অন্যদিকে খুব ছোট বাচ্চা, বয়স্ক ব্যক্তি, যারা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকেন তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। শরীরে রোগ প্রতিরোধী উপাদান তৈরির জন্য প্রয়োজন প্রোটিন। আবার অনেকে করোনার সময় রোগ প্রতিরোধের জন্য ভিটামিন-ডি, ক্যালসিয়ামের প্রতি খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং ওষুধ খাচ্ছেন। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, নিয়মিত একটি ডিম কিন্তু আপনার এসব চিন্তার সমাধান হতে পারে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে রাখতে পারে কার্যকর ভূমিকা। তবে সবাই ডিম খাবেন কি খাবেন না তা নিয়ে জনমনে দ্বিধার কমতি নেই। মানুষের মনের এ সংশয় কাটাতে প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় ‘বিশ্ব ডিম দিবস’। ভিয়েনায় ১৯৯৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন (আইইসি) কর্তৃক অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ সম্মেলনে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, স্বাস্থ্যবান ও মেধাবী জাতি গঠন, সর্বোপরি ডিমের গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতিবারই একটি করে প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। যেমন ‘সুস্থ সবল জাতি চাই, সব বয়সেই ডিম খাই’, ‘সুস্থ যদি থাকতে চান, প্রতিদিন ডিম খান’, ‘জীবনের জন্য আমিষ’ ইত্যাদি। এবারের প্রতিপদ্য ‘প্রতিদিন ডিম খাই, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াই’। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই ২৪ বছর ধরেই মানুষের মাঝে ডিমের গুণাগুণ, ডিম উৎপাদনের সমস্যা ও সম্ভাবনা এবং দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রতিদিন ডিম খাওয়া উচিত- এ বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্ব ডিম দিবস পালিত হয়ে আসছে।একজন মানুষের সুস্থভাবে জীবনযাপনের জন্য বছরে কমপক্ষে ১০৪টি ডিম খাওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বাংলাদেশের মানুষের বছরে গড় ডিম খাওয়ার পরিমাণ মাত্র ৪৫ থেকে ৬০টি। কিছু কিছু ভুল ধারণার কারণে আমাদের দেশের মানুষের ডিম খাওয়ার প্রবণতাও সন্তোষজনক নয়। আবার ডিম উৎপাদনে অনেকটা ঘাটতিও রয়েছে নিঃসন্দেহে। ডিম খাওয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা : প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় বিশেষ করে সকালের নাশতায় সবাই ডিম খেতে পছন্দ করেন। সময়স্বল্পতার জন্য ভাতের সঙ্গে তরকারির বিকল্প হিসেবে ডিম ভাজি বা ভর্তা করেও অনেককে খেতে হয়। তবে অনেকের মধ্যেই ডিম নিয়ে এক ধরনের ভুল ধারণা আছে তা হলো- সব বয়সে ডিম খাওয়া যায় না, বিশেষ করে বয়স্করা এবং যারা বিভিন্ন রোগে ভোগেন, তারাও ডিম খেতে চান না অথবা মনে করেন দিনে একটির বেশি ডিম খাওয়া যায় না। আবার অনেক স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ মনে করেন ডিমের সাদা অংশ খাওয়া ভালো তবে কুসুম খাওয়া উচিত নয়। কিন্তু ডিমের কুসুমটাও যে শরীরের পক্ষে কততা উপকারী, তা অনেকেই জানেন না। আসল সত্য হলো, আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানী ও ডাক্তারদের মতে, ডিমের সাদা অংশের চেয়ে কুসুমে ক্যালরি বেশি। যে কোনো বয়সেই ডিম খাওয়া যায়, এমনকি দিনে কয়েকটি ডিম খেতেও বাধা নেই। সুস্বাস্থ্য এবং সুস্থ জাতি গঠনে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জন্য ডিম হতে পারে খাদ্যের অন্যতম উৎস। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন অন্তত একটি করে ডিম খাওয়া উচিত, যা প্রোটিনের চাহিদা মেটাবে।প্রশ্নটা হলো, প্রতিদিন বা নিয়মিত ডিম খাওয়া যাবে কি যাবে না? এ নিয়ে ডাক্তার, রোগী এমনকি সুস্থ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল এবং এখনো আছে। বিশেষ করে যাদের বয়স একটু বেশি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন এমন রোগী অথবা যাদের রক্তে কলেস্টেরল বা অন্যান্য চর্বির পরিমাণ বেশি, তাদের ডিম খেতে নিষেধ বা সম্পূর্ণ বর্জন করতে বলা হয়। অনেকেই এমনকি কিছু কিছু চিকিৎসক আবার ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশটুকুই খেতে বলেন। এর কারণ তাদের ধারণা একটাই, তা হলো ডিম খেলে রক্তের কলেস্টেরল বাড়ে, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। আসলে এত দিনের এ ধারণাটা মোটেই সত্য নয়। ডিম খেলে রক্তের কলেস্টেরলের মাত্রা ততটা বৃদ্ধি পায় না। একজন পূর্ণবয়স্ক সুস্থ মানুষ দৈনিক গড়ে ৩০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কলেস্টেরল গ্রহণ করতে পারেন। আর একটি ডিমে রয়েছে মাত্র ২০০ মিলিগ্রাম কলেস্টেরল। তাই বিশেষজ্ঞরা এমনকি আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এখন আর তাদের খাদ্যের গাইডলাইনে ডিম খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করছেন না। যে কোনো ব্যক্তি ডিমের সাদা অংশ খেলে কোনো সমস্যা তো হবেই না, এমনকি কুসুমসহ সম্পূর্ণ ডিম খেলেও উচ্চ রক্তচাপ, কলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকির আশঙ্কা নেই বললেই চলে। আরেকটি বড় গবেষণায় প্রতীয়মাণ হয়েছে, প্রতি সপ্তাহে ৫-৬টি ডিম খেলে হৃদরোগ, স্ট্রোক বা হার্টের অন্যান্য ধরনের জটিলতা তৈরি হবে এমন কোনো ঝুঁকি নেই। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে বলা হয়, দিনে একটি ডিম হার্টের জন্য ক্ষতিকর নয়। সকালের নাশতায় বরং একটি ডিম কলেস্টেরল প্রোফাইলের ওপর তেমন প্রভাব ফেলে না, যতটা প্রভাব ফেলে আপনার সকালের নাশতায় মিষ্টি বা চর্বি জাতীয় খাবার খেলে।ডিমের পুষ্টিগুণ : ডিমের মধ্যে আছে পানি, প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন-এ, ই, বি-৬, বি-১২, ফলেট, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, আয়রন, খনিজ পদার্থ যেমন জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম ইত্যাদি। বলতে গেলে ডিমে সব ভিটামিনই কমবেশি থাকে, তবে ভিটামিন-সি কিন্তু নেই। শরীরের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কোলিন, যা কেবল ডিমেই বেশি পাওয়া যায়, অন্যান্য সহজলভ্য খাদ্যে ততটা পাওয়া যায় না। খাদ্যের এ উপাদানগুলো ডিম খেলে সহজেই পাওয়া যায় এবং দামেও সাশ্রয়ী। ডিমের মধ্যে যে প্রোটিন, ভিটামিন বি-১২, রাইবোফ্ল্যাভিন, ফলেট ও ভিটামিন-ডি রয়েছে, তা কলেস্টেরল বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে দেয়। এমনকি অনেকদিন ফ্রিজে সংরক্ষিত বা প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার চেয়ে ডিম ভালো বিকল্প খাদ্য হতে পারে। এ ছাড়া আমাদের আমিষের মূল উৎস ডিম, মাছ, দুধ, ডাল এবং যে কোনো মাংস যেমন হাঁস, মুরগি, গরু, ভেড়া, মহিষ, খাসি ইত্যাদি। তুলনা করলে দেখা যায়, মাংস এমনকি দুধের দামও বেশি, সে হিসেবে ডিম বেশ সস্তা, প্রোটিনের অন্যতম উৎস। ডিমে সুলভ মূল্যে উচ্চমাত্রার প্রোটিন পাওয়া যায়।হাঁস না মুরগি? লালচে না সাদা? : অনেকে হাঁস বা মুরগির ডিম এমনকি সাদা বা লালচে ডিম খাওয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন। আসলে সব ধরনের ডিমের পুষ্টিগুণ একই রকম। তবে হাঁসের ডিমে প্রোটিন ও চর্বির মাত্রা সামান্য বেশি, খেতে কোনো মানা নেই। কেউ কেউ আবার কাঁচা ডিম খেতে পছন্দ করেন, এমনকি কাঁচা ডিমের পুষ্টিগুণ বেশি বলে মনে করেন, এ ধারণাটাও সত্য নয়। বরং কাঁচা ডিম খেলে সালমোনেলা জাতীয় ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্তের ঝুঁকি থাকে। আবার কোয়েলের ডিম খাওয়া নিয়েও অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন, যা আকারে ছোট। পাঁচটি কোয়েলের ডিম একটি মুরগির ডিমের সমান। পুষ্টিগুণ কিন্তু একই রকম। আবার এ কথাও সত্য, ডিম যেভাবেই রান্না হোক, এর পুষ্টিগুণ প্রায় অবিকৃত থাকে, এমনকি পেটে সহজেই হজম ও সম্পূর্ণ শোষিত হয়।দিনে কটি ডিম খাওয়া যাবে? : তরুণরা এবং যারা বেশি কায়িক পরিশ্রম করেন, তারা নিয়মিত ডিম খেতে পারেন, এমনকি দিনে দু-তিনটি ডিম খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ। বয়স্করাও সপ্তাহে পাঁচ-ছয়টি ডিম খেতে পারবেন। আর যারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছেন, তাদের সুস্বাস্থ্যের জন্যও নিয়মিত ডিম খাওয়া উচিত। তবে কিডনি অকেজো বা রেনাল ফেইল্যুরের রোগী ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ডিম খাবেন, কারণ কিডনি ফেইল্যুরে প্রোটিন কম খাওয়া উচিত। কারও কারও বেলায় ডিম খেলে অ্যালার্জি জাতীয় সমস্যা হতে পারে, সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।ডিম নিয়ে কিছু টিপস : ডিম অবশ্যই একটি প্রাকৃতিক পুষ্টিকর খাদ্য, যার মধ্যে খাদ্যের সব উপাদানই বিদ্যমান। সব বয়সের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ডিম অত্যন্ত কার্যকর। শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি, হাড় গড়নে ও মেধার বিকাশে ডিম খুবই কার্যকর।মহিলাদের শারীরিক চাহিদা পূরণ ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে ডিম অত্যন্ত জরুরি। অন্ত্রের ক্যান্সার প্রতিরোধেও ডিম উপকারী। ডিমের কুসুমে ‘কোলিন’ থাকে, যা মস্তিষ্কের বিকাশ ত্বরান্বিত করে, এমনকি মনোরোগ এবং আলঝেইমারের মতো রোগ কমাতে সহায়তা করে।ডিম গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য প্রধানতম প্রোটিন জোগায়। ডিমের প্রোটিন মানুষের মস্তিষ্ক ও মাংসপেশির গঠন এবং রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।ডিমে কলেস্টেরল আছে বটে, কিন্তু তা রক্তের কলেস্টেরল বৃদ্ধি করে না। বরং রক্তের ভালো কলেস্টেরল (এইচডিএল) বৃদ্ধি করে। শুধু তাই নয়, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসমৃদ্ধ ডিম রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড অত্যন্ত কার্যকরভাবে কমায়।প্রতিদিন কুসুমসহ একটি করে ডিম খেলে হৃদযন্ত্র ও শরীরের রক্ত সঞ্চালনে কোনো ঝুঁকি নেই বরং তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। ডিমের কুসুম রক্তকণিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে রক্ষা করে, লোহিত কণিকার সংখ্যা ও মস্তিষ্কে অক্সিজেন বৃদ্ধি করে এবং ব্রেইনের স্ট্রোক কমাতে সহায়তা করে।ডিমে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যথেষ্ট পরিমাণে থাকে, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতায় সহায়ক।ডিমে আছে ভিটামিন-‘এ’, যা দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে, অন্ধত্ব দূরীকরণেও সহায়ক। ডিমের কেরোটিনয়েড, ল্যুটেন, জিয়াজেনথিন বয়সকালে চোখের মেকুলার ডিজেনারেশন হওয়ার আশঙ্কা কমিয়ে দেয়। এটি চোখের ছানি কমাতেও সহায়তা করে।ডিমের কুসুমে প্রচুর ভিটামিন ‘কে’ আছে। এটি রক্তের বিভিন্ন কাজে সহায়ক, হাড় শক্ত ও মজবুত করে এবং প্রজনন-অক্ষমতা দূর করতে সহায়তা করে।সকালের নাশতায় একটি সেদ্ধ ডিম খেলে পেটটা অনেকক্ষণ ভর্তি থাকে, খিদে কম পায় ফলে খাদ্য গ্রহণ নিয়ন্ত্রিত হয়। অনেকের ধারণা, কুসুম খেলে মোটা হয়ে যাবে, ব্যাপারটা আসলে তা নয়। ডিমে রয়েছে প্রচুর শক্তি যা রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধে কিছুটা হলেও কার্যকর।পরিশেষে বলতে চাই- ডিম নিয়ে একদিকে যেমন রসালো কথার শেষ নেই, কথায় কথায় পরীক্ষায় খারাপ হলেই বলে ‘ডিম পাবে’, নেতিবাচক কোনো কথা হলেই বলা হয় ‘ঘোড়ার ডিম’, রাস্তায়, নাটকে বা অনুষ্ঠানে ক্ষুব্ধ হলেই জনতা ছুড়ে মারে ‘পচা ডিম’। তেমনি সুস্বাস্থ্য ও খাদ্যের জরুরি উপাদান এবং প্রোটিন গ্রহণের জন্য নিয়মিত ডিম খাওয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক বা বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। এমনকি সম্প্রতি স্কুলগুলোতে মিডডে মিলের মান নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা, সে খাদ্য তালিকায়ও কিন্তু ডিম অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মেধাবী, সুস্থ-সবল, উন্নত জাতি গঠনে স্বল্প ব্যয়ে পূর্ণাঙ্গ পুষ্টির উৎস হিসেবে ডিমের কোনো বিকল্প নেই।’ (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৯.১০.২০২০) (তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)আবদুল্লাহ আল মোহন১২ অক্টোবর, ২০১৮ / ১১ অক্টোবর, ২০১৯/ ৯ অক্টোবর, ২০২০

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর