Sunday, মে ১৯, ২০২৪
শিরোনাম

প্রমথনাথ বিশী : জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

আবদুল্লাহ আল মোহন
১.
সাহিত্যিক, গবেষক প্রমথনাথ বিশী । একজন সৃজনশীল লেখক ও মননশীল গবেষক হিসেবে প্রমথনাথ বিশীর বিশেষ সুখ্যাতি আছে। লেখক, শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশী ১৯০১ সালের ১১ জুন নাটোরের জোয়াড়ি গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, ১৯৮৫ সালের ১০ মে কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। মেধা, প্রখর বুদ্ধি, অধ্যয়ননিষ্ঠা, কবি-প্রতিভা ইত্যাদি গুণাবলির জন্য রবীন্দ্রনাথের স্নেহ লাভ করেন। তিনি ১৯৬২-৬৮ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন এবং ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন।তিনি আনন্দ পুরস্কারও লাভ করেন।
২.
নানা বিষয়ে প্রমথনাথ বিশীর বইয়ের সংখ্যা একশোর কাছাকাছি। গদ্য-পদ্যে সমান দক্ষ। প্রকৃতি ও নারীপ্রেম তাঁর কবিতায় মনোজ্ঞভাবে উপস্থিত। তাঁর মতো এত বেশি সনেট বাংলায় আর কেউ লেখেননি বলেই জানা যায়। হাস্যরসাত্মক নাটক লেখায়ও কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাস এবং সামাজিক উপন্যাস দুইরকমই লিখেছেন। কবিতা, নাটক, উপন্যাস, রম্যরচনা ইত্যাদি লিখলেও, মূল খ্যাতি কিন্তু রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ ও সাহিত্যসমালোচক হিসাবে। তিনি মধুসূদন এবং বঙ্কিম সাহিত্যেরও দক্ষ আলোচক হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন।
৩.
আমার বিশেষ প্রিয় একটি গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ-শিলাইদহ সম্পর্ক নিয়ে প্রমথনাথ বিশীর লেখা ‘শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ’ বইটি। গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহের বসবাস, জমিদারি তদারকি, সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে আলোচনা ও বিবরণ রয়েছে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রচারণভূমি শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুর নিয়ে গবেষণাধর্মী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তবে রবীন্দ্রস্মৃতিধন্য শিলাইদহ সম্পর্কিত গ্রন্থের সংখ্যাই বেশি। এর কারণ হিসেবে জমিদারি তদারকিতে শিলাইদহে কবির অবস্থানকে যতটা বিবেচনা করা যায়, তার চেয়ে বেশি বিবেচনা করা যায় সেখানে কবির অজস্র রচনার স্থানকে। আমরা জানি, রবীন্দ্র-সাহিত্য পাঠকের কাছে শিলাইদহ-শাজাদপুর বা পতিসর কেবল তিনটি স্থানের নাম নয়, তা তাঁদের কাছে প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি কাছের করে পাওয়ার ও জানার নাম। বস্তুত রবীন্দ্রভুবনে অধুনা বাংলাদেশের অন্তর্গত এই তিনটি স্থান দখল করে রেখেছে রবীন্দ্রজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁককে। সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যথার্থই বলেন ‘জোড়াসাঁকোতে জন্মলাভ হলেও রবীন্দ্রনাথ যথার্থ ভূমিষ্ঠ হলেন শিলাইদহে এসে।’ আরও বলা যেতে পারে, রবীন্দ্রনাথ পদ্মাকে দেখেছিলেন, বাংলাদেশকে বুঝেছিলেন আর তাঁর সেই দেখা আর বোঝা বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রবাহে যোগ করেছে কিছু অমর সৃষ্টি। বাংলাদেশের এই পর্বটিকে বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিমানস ও সাহিত্যমানসকে বোঝা যায় না, অসম্পূর্ণ রয়ে যায় রবীন্দ্রনাথকে জানা। আমরা তাই দেখি পদ্মার উর্বর ভূমিখণ্ডে একে-একে ফলেছে রবীন্দ্রসৃষ্ট ফসল। রবীন্দ্রজীবনের এই উর্বর বাঁকে পদ্মার দান অতুলনীয়। প্রমথনাথ বিশী শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে বলেছেন, ‘পদ্মাকে যে দেখেনি বাংলাদেশকে দেখেনি সে, পদ্মাকে যে জানে না বাংলাদেশকে জানে না সে, পদ্মাকে যে বোঝেনি, বাংলাদেশকে বোঝেনি সে; যা কিছু দেখা জানা বোঝা সমস্ত সংহত এই নদীটির মধ্যে।’ ‘শিলাইদহে আমার রচনা অজস্রভাবে পৃথিবীর আলোর কাছে প্রকাশ পেয়েছিল’-কবির এই স্বীকারোক্তিতেই এর প্রমাণ মেলে। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহপর্ব নিয়ে তার বইটি আমার মতোন পাঠকের আগ্রহকে আরো বাড়িয়েই তোলে।
৪.
আবার প্রমথনাথ বিশীর (ইংরেজি: Pramathanath Bishi) (জন্ম : ১১ জুন ১৯০১ – প্রয়াণ : ১০ মে ১৯৮৫)‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ বইটিও আমার পেছন্দের আরেকটি বই। বইটি পড়ে রসিক রবীন্দ্রনাথকে যেমন জানি, তেমনি শান্তিনিকেতনের নানা জলছবি জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর লেখনির কল্পশক্তিতে। একটি রবীন্দ্র-অনাস্বাদিত নাট্যকথার গল্প শোনা যাক প্রমথনাথ বিশীর ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ গ্রন্থ থেকে, ‘আমাদের যাত্রাপালার সাফল্য দেখিয়া রবীন্দ্রনাথে ঝোঁক হইল যাত্রা লিখিবেন। একদিন আমাকে বলিলেন, “দেখ্, এবার যাত্রাপালা লিখব ভাবছি।” আমি বলিলাম, “সাহিত্যের সব পথই তো আপনার পদচিহ্নিত; এক-আধটা গলিপথও কি আমাদের মতো আনাড়িদের জন্য রাখিবেন না?” আমার কথা শুনিয়া তিনি কী ভাবিলেন জানি না। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, যা।” ভাবটা এই, ‘ও পথটা তোদেরই ছাড়িয়া দিলাম।’ জানা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এরপর আর যাত্রাপালা লেখেননি। ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’ বইতেই তিনি বাঙালির স্বরূপ খুঁজতে গিয়ে বলেছিলেন, “যে কাজ একাকী করা যায় বাঙালী তাহা করিতে পারে। পাঁচজনে মিলিয়া কাজ করিতে গেলেই বাঙালী দলাদলি ও মাথা-ফাটাফাটি করিয়া বসে। সাহিত্য এককের সাধনা, বাঙালী তাহাতে ভারতীয় জাতির মধ্যে অবিসংবাদী শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছে। প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা পাঁচজনের কাজ— বাঙালীর তাহাতে দুর্বলতার অন্ত নাই।”
৫.
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার শিক্ষক প্রমথনাথ বিশীর স্মৃতিচারণ করে লিখছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ছি তখন তিন জন মাস্টারমশাই আমাদের চোখে প্রায় নায়ক ছিলেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী এবং শংকরীপ্রসাদ বসু। শঙ্করীবাবু পড়াতেন বৈষ্ণব পদাবলী, আবার আনন্দবাজারে একের পর এক ক্রিকেট নিয়ে লিখে যাচ্ছিলেন। আমাদের সঙ্গে একটু দূরত্ব রাখতেন। প্রমথনাথ ছিলেন আপাত গম্ভীর, কিন্তু ক্লাসে পড়ানোর সময় সেই ছদ্মবেশ সরে যেত। নারায়ণবাবু ছিলেন আমাদের কাছের মানুষ, নিজেকে ওঁর ভাই ভাবতে ভাল লাগত।’ কলেজ স্ট্রিটের একটি প্রকাশনীতে বিকেলবেলায় সাহিত্যিকরা আড্ডা মারতে আসেন। সেই আড্ডার মানুষ প্রমথনাথ বিশীর সরসতার কথাও লিখেছেন সমরেশ মজুমদার। তার ভাষায়, ‘জানতে চাইলাম, ‘তুই জানিস কারা কারা আড্ডায় আসেন?’ শংকর নামগুলো বলেছিল, ‘সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, তারাশংকর, বিমল মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত, গজেন্দ্রকুমার মিত্র ইত্যাদি ইত্যাদি।’ আমাদের চোখ কপালে উঠল। ওঁরা সবাই একসঙ্গে হন? অতএব চলে গেলাম। সরু প্যাসেজের শেষে একটি ঘর থেকে ওঁদের গলা ভেসে আসছিল। আমরা তখন কুড়ি বা একুশ। আমাদের দেখে ওঁরা যদি রেগে যান। প্যাসেজে দাঁড়িয়ে সাহস খুঁজছিলাম। সামনে দিয়ে মুড়ি তেলেভাজা নিয়ে একজন কর্মচারী ঘরের ভেতরে চলে গেল। হঠাৎ একটি গলা কানে এল, ‘জাপানের গেইশারা খুব যত্ন করে।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রমথনাথ বিশীর গলা শুনতে পেলাম, ‘তা হলে একবার জাপানে যেতে হবে।’অন্য একটি কণ্ঠ শুনলাম, ‘না হে প্রমথ, এভরি ফোর্থ গেইশার অসুখ আছে। প্রমথনাথ বললেন, ‘ঠিক আছে আমি থার্ডের পর ফিফ্থকে মিট করব।’ সঙ্গে সঙ্গে তুমুল হাসির আওয়াজ ভেসে এল ঘর থেকে। আমরা তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। বড়দের এই আড্ডায় আমরা যে অবাঞ্ছিত তা বুঝতে দেরি হয়নি। পরে জেনেছি গেইশাদের প্রশংসা করেছিলেন শ্রদ্ধেয় ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। আর সতর্ক করেছিলেন সাংবাদিক ভূপেন রায় মশাই।’
৬.
প্রমথনাথ বিশী ১৯০১ সালের ১১ জুন নাটোরের জোয়াড়ি গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা নলিনীনাথ বিশী ও মাতা সরোজবাসিনী দেবী, স্ত্রী সুরুচি দেবী। তাঁর পিতা নলিনীনাথ বিশী ছিলেন বৃহত্তর রাজশাহী জেলার মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট এবং প্রভাবশালী জমিদার কেশবনাথ বিশীর দত্তক পুত্র।
৭.
প্রমথনাথ ১৯১০ সালে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এক নাগাড়ে সেখানে সতের বছর অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। মেধা, প্রখর বুদ্ধিবৃত্তি, অধ্যয়ননিষ্ঠা, কবিপ্রতিভা ইত্যাদি গুণের জন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। রবীন্দ্রনাথের নিকট তিনি অভিনয় শেখেন এবং পরে তাঁর লেখা কয়েকটি যাত্রাপালা শান্তিনিকেতনে অভিনীতও হয়।
৮.
প্রমথনাথ ১৯১৯ সালে শান্তিনিকেতন থেকে ম্যাট্রিক পাস করে সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং ১৯২৭ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বি. (১৯২৯) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে বাংলায় এমএ (১৯৩২) ডিগ্রি লাভ করেন। রামতনু লাহিড়ী গবেষণা বৃত্তি (১৯৩৩-৩৬) নিয়ে গবেষণা করার পর ১৯৩৬ সালে তিনি রিপন কলেজে অধ্যাপক পদে যোগদান করেন।
৯.
দীর্ঘকাল রিপন কলেজে অধ্যাপনা করার পর ১৯৫০ সালে প্রমথনাথ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যোগদান করেন এবং রবীন্দ্র অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হয়ে ১৯৭১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। মাঝখানে চার বছর (১৯৪৬-৫০) তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন। প্রমথনাথ কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা (১৯৬২) এবং রাজ্যসভার সদস্য (১৯৭২) নির্বাচিত হন।
১০.
গবেষণার ক্ষেত্রে প্রধানত রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এক্ষেত্রে রবীন্দ্র কাব্যপ্রবাহ (২ খন্ড, ১৯৩৯), রবীন্দ্র বিচিত্রা (১৯৫৫), রবীন্দ্র নাট্যপ্রবাহ (২ খন্ড, ১৯৬২), রবীন্দ্র সরণী (১৯৬৬) প্রভৃতি গবেষণাগ্রন্থ তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। তিনি মধুসূদন ও বঙ্কিম সাহিত্যেরও একজন দক্ষ সমালোচক ছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৯৫৪), বঙ্কিম সরণী (১৯৬৫) ও মধুসূদন থেকে রবীন্দ্রনাথ (১৯৭৪) তাঁর এ বিষয়ক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
১১.
গবেষণাগ্রন্থ ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতা এবং ব্যঙ্গ রচনার ক্ষেত্রেও প্রমথনাথ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। কমলাকান্ত, বিষ্ণুশর্মা, অমিত রায়, মাধব্য ও স্কট টমসন ছদ্মনামে তিনি এসব লিখতেন। তাঁর রচিত উপন্যাস ও গল্পের মধ্যে কয়েকখানি প্রধান গ্রন্থ হলো: জোড়াদিঘির চৌধুরী পরিবার (১৯৩৮), কেশবতী (১৯৪১), গল্পের মতো গল্প (১৯৪৫), ডাকিনী (১৯৪৫), ব্রহ্মার হাসি (১৯৪৮), সিন্ধুদেশের প্রহরী (১৯৫৫), চলন বিল (১৯৫৭), অলৌকিক (১৯৫৭), কেরী সাহেবের মুন্সী (১৯৫৮), স্বনির্বাচিত গল্প (১৯৬০), লালকেল্লা (১৯৬৩) ইত্যাদি। দেওয়ালী (১৯২৩) তাঁর প্রথম কবিতার গ্রন্থ। এছাড়া আছে বসন্তসেনা ও অন্যান্য কবিতা (১৯২৭), হংসমিথুন (১৯৫০), উত্তরমেঘ (১৯৫৩), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৬১) ইত্যাদি। ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব (১৯৫১), বিচিত্র উপল (১৯৫১) তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ।
১২.
কেরী সাহেবের মুন্সী ও লালকেল্লা তাঁর দুটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। প্রথমটিতে ব্রিটিশ যুগের এবং দ্বিতীয়টিতে মুগল যুগের পটভূমিতে ব্যক্তি, সমাজ ও ইতিহাসের বিচিত্র বর্ণনা আছে। মানবচরিত্রের সূক্ষ্ম অনুভূতিসমূহ সরস ভাষায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তিনি বর্ণনা করেছেন। নেহেরু: ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব নামে তিনি একটি রাজনৈতিক গ্রন্থও রচনা করেন। সাহিত্যচর্চা এবং গবেষণায় কৃতিত্বের জন্য প্রমথনাথ রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬০), বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২) ও জগত্তারিণী পুরস্কার (১৯৮৩) লাভ করেন।
১৩.
এবার হাস্যরসিক রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথনাথ বিশীর সরসতার এক চামচ উদাহরণ তুলে ধরা যাক। রবীন্দ্রনাথ ও চিনির রস বিষয়ে। রসের পথিক রবীন্দ্রনাথ রস নিয়ে কী কী লিখছেন, এই নিয়ে আমাদের গবেষনা এখনো শেষ হয়নি। আপাতত আমরা রসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান চিনি নিয়ে তিনি কী লিখেছেন, সেটার কিছুটা জানা হোক। আমরা জানি, ইংরেজ মরিস সাহেব শান্তিনিকেতনে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষা পড়াতেন। একদিন তিনি তাঁর ছাত্র প্রমথনাথ বিশীকে বললেন, ”গুরুদেব সুগার বা চিনি বিষয় একটা গান লিখেছেন। গানটি খুবই মিষ্টি হয়েছে। ” প্রমথনাথ বিশী বললেন, ” সুগার নিয়ে গান লিখলে তো মিষ্টি হবেই। গানটা কী রকম একটু গেয়ে শোনান তো ! ” মরিস গাইতে লাগলেন – ” আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী, তুমি থাক সিন্ধুপারে…।” প্রমথনাথ বিশী হেসে বললেন, ” গানটাতে বেশ ক চামচ চিনি দিয়েছেন গুরুদেব। তাই একটু বেশি মিষ্টি হয়েছে। তবে এই চিনি যে সুগার, সেটা আপনাকে কে বলল ? ” কে আবার। স্বয়ং গুরুদেব আমাকে বলেছেন, ”মরিস শোন, আমি সুগার নিয়ে একটা গান লিখেছি।”
১৪.
প্রমথনাথ বিশী কবিতাও লিখেছেন। অনেক কবিতার মধ্য থেকে একটি প্রিয় কবিতা ‘সে তোমার হাসি’ তুলে ধরে মূলতবি টানছি।কবিতাটি পাঠ করা যাক-
‘হঠাৎ বসন্তে কবে রাকাদীপ্ত চামেলির বনে
উচ্ছ্বাস উঠিয়াছিল দক্ষিণ পবনে
ঝরেছিল শুভ্র ফুলরাশি
সে তোমার হাসি

হঠাৎ কোটালে কব্ উন্মথিত মত্ত পারাবার
জ্যোত্সনার মর্মরে গাঁথা সৌকতে তাহার
ছুঁড়েছিল স্বচ্ছ শুক্তিরাশি,
সে তোমার হাসি

ইন্দ্রের বিলাসলগ্নে সুখ স্বর্গপুরে
পুরুরবা স্মৃতিদষ্ট ঊর্বশীর বিভ্রান্ত নূপুরে
যে-চমক উঠিল উদ্ভাসি,
সে তোমার হাসি

রিক্ত পদ্ম মানসের অশ্রুর স্ফটিকে
মধ্য রজনীর চন্দ্র তন্দ্রাহীন চাহি অনিমিখে
যে শুভ্রতা তুলিছে বিকাশি,
সে তোমার হাসি

রজনীগন্ধার দন্ডে যে পেলব চিক্কণ আবেশ
মূর্চ্ছিত জ্যোত্স্নার মত রচি পরিবেশ
দিবাকান্তি দেয় পরকাশি
সে তোমার হাসি

পরম প্রণয় ক্ষণে ছিন্নগ্রন্থি মুক্তাহার দ্যুতি
স্তিমিত বাসব ক্ষেত্রে বাসনার যুথী
মুহুর্মুহু তোলে যে উচ্ছ্বাসি,
সে তোমার হাসি

বাণীর মুকুটলগ্ন দিব্যবিভা শ্বেত শতদলে
কবির প্রতিভাস্পর্শে যে আলোক ঝলে
প্রকাশের আর্তিতে উল্লাসি,
সে তোমার হাসি

আমার বিস্মৃতি তলে চোতন্যের গোপন প্রবাহে
কোথা হতে পড়ে আলো, জ্বলে ওঠে তাহে
গুচ্ছ গুচ্ছ জ্যোতিঃ কুন্দরাশি,
সে তোমার হাসি

তোমার অস্তিত্ব সুধা বিগলিত তরল ধারায়
শিশিরাস্ত হিমানীর প্রবাহিনী প্রায়
ধরাইছে ফুল্ল ফেণরাশি
সে তোমার হাসি

(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ, দৈনিক সংবাদ, শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথনাথ বিশী, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৭২, ইন্টারনেট)

আবদুল্লাহ আল মোহন
১১ জুন, ২০১৬/ ১১ জুন, ২০১৮

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর