Sunday, মে ১৯, ২০২৪
শিরোনাম

খোকা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান : বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

(রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় অনুসন্ধান : জাতির জনকের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া অনুসরণ)


আবদুল্লাহ আল মোহন
১.
১৫ আগস্ট, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাৎবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস। পঁচাত্তরের ওই কালরাতে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক-দালালদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন বাঙালির স্বপ্নদ্রষ্টা, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি বাঙালি জাতির হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর নাম। তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যকারীরাই আজ বিলীন হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন বাঙালির হৃদয়ে। এটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস। গোটা জাতি পালন করবে বাঙালির শোকাবহ এই দিনটি। আগস্টের প্রথম দিন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ পুরো আগস্ট মাসকে শোকের মাস হিসেবে পালন করে, পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে মোকাবিলায় দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে পথ চলে। ভাসানটেক সরকারী কলেজ, ঢাকার পক্ষ থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সকল শহীদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই। উল্লেখ্য যে, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের অজ-পাড়াগাঁ মধুমতি আর বাঘিয়ার নদীর তীরে এবং হাওড়-বাঁওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার অবারিত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারে জন্ম নেয়া খোকা নামের শিশুটি কালের আবর্তে হয়ে উঠেছিলেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির ত্রাণকর্তা ও মুক্তির দিশারি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিন পালিত হচ্ছে চলতি বছর। দিনটিকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও উদ্‌যাপন করে পুরো জাতি। গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। এক বর্ণাঢ্য সংগ্রামবহুল জীবনের অধিকারী এই নেতা বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে। তাঁর বাবা শেখ লুৎফর রহমান এবং মা শেখ সায়েরা খাতুন। ৪ কন্যা এবং ২ পুত্রসন্তানের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। মা-বাবা তাঁকে ‘খোকা’ বলে ডাকতেন। রচনাটি গোপালগঞ্জের ‘খোকা’ ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’র ‘জাতির জনক’ হয়ে ওঠার অনন্যসাধারণ পথযাত্রার বাঁকগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা, ‘রাজনীতির কবি’র জীবনপুরের অবিচল পথের অনুসন্ধিৎসু পরিব্রাজক হিসেবে, ইতিহাসের পথিক হিসেবে সঠিক রাস্তায় থেকে। জাতির জনকের শততম জন্মদিনের পথের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পথ থেকে পথে চলার আজন্মের সাধনার, জীবনাদর্শের দীর্ঘ অনুশীলন ও অসম্ভব কষ্টসহিষ্ণু প্রক্রিয়ার কাহিনিকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে, অল্প কথায় তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। আর ব্যক্তিত্বটি যদি হন হিমালয় সম উচ্চতা সম্পন্ন, তাহলে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর মতোন করে বলতেই হয়, ‘আমি হিমালয় দেখিনি দু:খ নেই কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছি।’ যমুনা নদীর জলের অতলে হারিয়ে যাওয়া ভূমিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই ‘যমুনা পুত্রের’র কাছে অন্নদাশঙ্কর রায়ের অমর কাব্যটিই চীরস্মরণীয় স্বাভাবিক কারণেই, ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা / গৌরী মেঘনা বহমান / ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান..’।
২.
পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই একটি জাতিকে জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল সুযোগ পেতে দেখা যায়। রক্তস্নাত মহান মুক্তিযুদ্ধের সুযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনকের জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। অতুলনীয় এই মহানায়কের পিতা-মাতা, স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের স্মরণ করছি সকৃতজ্ঞ চিত্তে, অবনত চিত্তে সম্মান জানাই ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের মহান ভাষা শহীদদের, ’৫৪, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯ ও অন্যান্য সংগ্রাম ও আন্দোলনের শহীদ আসাদ, মতিউর, সার্জেন্ট জহুরুল হক, অধ্যাপক শামসুজ্জোহাসহ শহীদদের সকলকে, মহান একাত্তরের শহীদদেরকে, নির্যাতিত মা-বোনকে, বীরাঙ্গনাদের, জাতীয় চারনেতা এবং সর্বোপরি সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতিও অসীম শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করছি। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতির জনকের ঘাতকেরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী- এই জাতীয় চারনেতাকে কাপুরুষের মতোন হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে জাতীয় এ চার নেতা দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্ব দান করে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা হয়ে ওঠার পথে পথে এদের সকলের ভূমিকাই আমার কাছে অনস্বীকার্য বলে বিবেচিত হয়েছে। বস্তুত বঙ্গবন্ধুকে একের পর এক ধাপ পার হতে হয়েছে স্বাধীনতার পথে। সেই ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৫৪ র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ‘৬৬ র ছয়দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০ এর নির্বাচনসহ সবশেষে মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমরা জেনে খুশি হই যে পাকিস্তানিরা ‘৫২ সালে ভাষা সৈনিকদের উপর গুলি চালিয়েছিল তারাই এখন দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে। ২৪ বছরের সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতির অনিবার্যতায় মার্চ মাস অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণায় প্রদত্ত নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্বাধিকার আন্দোলনে এবং চূড়ান্ত পর্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দেন। এ সবগুলো ধাপ জয় করেই তিনি দেশ স্বাধীন করেছেন। এখানেই তিনি অনন্য, অবিনশ্বর। প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা। তার দীর্ঘদিনের নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ তথা পাকিস্তানি আধিপত্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছে আমাদের স্বদেশ ভূমিকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্যোক্তা বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন আদর্শে জাতীয়তাবাদী ও বিশ্বাসে গণতন্ত্রী। তাই তো তিনি কর্মী থেকে হয়েছেন নেতা, আর নেতা থেকে হয়েছেন জননেতা, জননেতা থেকে হয়েছেন জাতির জনক। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে একটি দলের নেতা থেকে হয়েছেন দেশনায়ক, রাষ্ট্রনায়ক।
৩.
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো সাধারণ মানুষ নন তিনি অনন্যসাধারণ, মহানায়ক- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তাই সেই মহানায়কের স্মৃতির সান্নিধ্য পেতে, বঙ্গবন্ধুর জাতির পিতা হয়ে ওঠা বুঝে নিতে বারবার ছুটে গিয়েছি গোপালগঞ্জে, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে। এই আলোচনাটি সংক্ষিপ্ত পরিসরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের নেতা হয়ে উঠেছিলেন তা উপলব্ধি করার চেষ্টা মাত্র। ঘরের কাছে বলে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর নিজ বাড়িতে যেতে হয় বারেবারে। যা এখন তার স্মৃতি জাদুঘরে পরিণত। সেখানে উপস্থাপিত বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচিহ্ন, বিভিন্ন ছবি দেখে বুঝে নিতে সচেষ্ট হই কীভাবে একজন শিশু খোকা যুবক মুজিব থেকে ধীরে ধীরে জাতীয় একজন মহান নেতায় পরিণত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাদুঘরের নতুন ভবনে সাজানো বঙ্গবন্ধুর ছোটবেলা থেকে নেতা হয়ে ওঠা পর্যন্ত সব ছবি ঘুরে ঘুরে দেখি আর প্রতিটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি, কীভাবে একজন মুজিব প্রথমে বঙ্গবন্ধু ও পরে জাতির জনক হয়ে ওঠেন। এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে রাজনীতিতে নিজেকে ধাপে ধাপে একজন যোগ্য নেতা হিসেবে গড়ে তোলেন সেটাই অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি। জেনেছি ব্যথিত হৃদয়ে, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিমাখা এই বাড়িটিতে তার পরিবারের সদস্যদের আসতে দেওয়া হয়নি অনেক বছর। বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তার পরিবারের কোনো সদস্য ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ওই ভবনের বারান্দার যে স্থানটাতে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতেন সেখানেও দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছি কীভাবে শত বাধা সত্ত্বেও একজন নেতা তার লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। পিতা-মাতার কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাদের প্রিয় খোকা। সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তার অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। আর এই দেশের ভুখা-নাঙ্গা, তাপক্লিষ্ট, কুলি-কামিন, মজুর, কৃষাণ-কৃষাণী, জেলে-বাওয়ালী, বঞ্চিত শ্রেণীর মানুষেরা ছিল তার রাজনীতির অবলম্বন। এদের জন্যই তিনি লড়েছেন। শৈশব থেকে আমৃত্যু দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে কাজ করেছেন তিনি। জাতি-বর্ণ, বিভেদ-বৈষম্য তার কাছে ছিল না। এ জন্যই তিনি বাঙালি জাতির জনক এবং বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা, স্বায়ত্তশাসনের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে, কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু কারারুদ্ধ হন। তার জীবনের নানা সময়ের প্রকৃতচিত্র, আসল ঘটনাবলি আমরা জানতে পারি দু’টি গ্রন্থ থেকে- শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’। এ দুটি গ্রন্থ তিনি লিখেছেন ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে। সেই গ্রন্থপাঠে আর স্মৃতির জাদুঘরে ঘুরতে ঘুরতে এক আত্মত্যাগী মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখা পাই, ইতিহাসের স্মৃতির পথে আমিও সহযাত্রী হয়ে যাই, ধানমন্ডি লেক ধরে হাঁটতেন পিতা, কবি বেগম সুফিয়া কামালের সাঁঝের মায়ার সামনে দিয়ে সদলবলে, সেই পথের পথিক হয়ে হেঁটেছি যেন জনকেরই সাথে। সুরসিক দুলাভাই কামালউদ্দীন আহমদ খান পরমাত্মীয় ‘শ্যালক’ শেখ মুজিবকে থামিয়ে মায়ামমতায় জিরিয়ে নিতে, একটু ডাবের পানি খেয়ে যেতে আহ্বান জানাচ্ছেন। বারান্দায় গাছের ছায়ায় বসে শ্যালক-দুলাভাইয়ের কথোপকথন আমার কানে আসে, ভাসে ‘ঐ মহামানব আসে’। ছুটে গিয়ে রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দাঁড়িয়ে ৭ মার্চের ভাষণ শুনি। আরেকটু এগিয়ে যাই ঢাকা গেটের দিকে। সেখানে তিন নেতার সমাধিস্থলে শুনতে পাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু দিবসে তার কবরে উপচে পড়া গোলাপের পাপড়ির পাশে ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীনকণ্ঠে ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাজারের পাশে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছি, আজ থেকে বাঙালি জাতির এই আবাসভূমির নাম হবে বাংলাদেশ।’ সেইসাথে শুনতে পাই প্রিয় জনকের প্রিয় গায়ক জাহিদুর রহিমের কণ্ঠে সুরধ্বণি ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। আমাদের ভালোবাসার চিরায়ত বাংলার অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির অনন্য প্রয়োগ দেখি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নানা ক্ষেত্রে। বিভিন্ন রাজনৈতিক জনসভা ও অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে এবং সমাপনীতে কোন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার উচ্চারণ নয়, আমাদের আবহমান বাংলার একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখতে পাই স্বদেশপ্রেমমূলক-লোকগীতি এবং রবীন্দ্র-নজরুলসহ বিভিন্ন ধারার সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমেই। বঙ্গবন্ধুর সেই অনুকরণীয় দেশজ সাংস্কৃতিক শিল্পকলার বিকাশ-প্রকাশমূলক মূল্যবোধের দৃশ্যমানতা আজ বিরলই বটে!
৪.
আমরা জানি, হাজার বছরের মধ্যে বাঙালির জীবনে কোনো দিন স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি। বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু, বাঙালির সহস্র বছরের স্বাধীন রাষ্ট্রীয় সত্তার প্রতিষ্ঠাতা। সেই হিসেবে তিনি মহানায়ক, মহান রাষ্ট্রনায়কও। অর্থাৎ রাষ্ট্রনায়কের যে গুণাবলি প্রয়োজন হয় একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের মানবগোষ্ঠীকে তার স্বাধীন সত্তায় প্রতিষ্ঠিত করতে, তার সব গুণই বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দেখা গিয়েছিল বলেই আজকে তাঁর এই অভিধা। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজউইক ম্যাগাজিন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে যে মন্তব্যটি উপস্থাপন করেছে, বস্তুতপক্ষে তা অত্যন্ত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। তা ছিল এ রকম, “মুজিব মৌলিক চিন্তার অধিকারী বলে ভান করেন না। তিনি একজন রাজনীতির কবি, প্রকৌশলী নন। শিল্প-প্রকৌশলের প্রতি উৎসাহের পরিবর্তে শিল্পকলার প্রতি ঝোঁক বাঙালীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। কজেই সকল শ্রেণী ও আদর্শের অনুসারীদের একতাবদ্ধ করার জন্য সম্ভবত তাঁর ‘স্টাইল’ সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল।” এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ৭ মার্চের ভাষণকে এক অনবদ্য কবিতা এবং বঙ্গবন্ধুকে মহাকবি হিসেবে ভূষিত করার অবারিত যুক্তি রয়েছে। এজন্যই বঙ্গবন্ধু বিশ্বপরিমন্ডলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এক অসাধারণ মহাগ্রন্থে। আবার, ১৯৭৫ এর ২৮ আগষ্ট তারিখে লন্ডনের ‘দি লিসনার’ পত্রিকায় বিবিসির সাংবাদদাতা ব্রায়ান ব্যারন-এর ভবিষ্যতবাণী- “বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে উচ্চতর আসনেই অবস্থান করবেন। তাঁর বুলেট-বিক্ষত বাসগৃহটি গুরুত্বপূর্ণ ‘স্মারক-চিহ্ন’ এবং কবরস্থানটি ‘পূণ্যতীর্থে’ পরিণত হবে”। বঙ্গবন্ধু সেই অসাধারণ অবিসংবাদিত নেতা যিনি সকল বাঙালির হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত ও তাঁর অবস্থানকে অত্যন্ত সুদৃঢ় করতে পেরেছেন। ‘রাজনীতির কবি’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বাঙ্গালীর বঙ্গবন্ধু নয়, বিশ্ব-বরেণ্য রাজনীতিক ‘বিশ্ববন্ধু’ উপাধিতেও বিশ্বনন্দিত। বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব- তিনি শুধু বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের একজন স্বপ্নদ্রষ্টাই ছিলেন না, অনন্যসাধারণ এক ঐক্যের বন্ধনে বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ করে হাজার বছরের বাঙালি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আগে ও পরে বহু খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ এসেছেন কিন্তু এমন করে কেউ বাঙালিকে জাগাতে পারেন নি। তাই বঙ্গবন্ধুকে প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি প্রয়োগের যেমন প্রয়োজন পড়ে না, তেমনি তাঁকে ইতিহাস থেকে নির্বাসিত করাও অসম্ভব। বঙ্গবন্ধু তাঁর নেতৃত্বের এক সম্মোহনী শক্তি ও যাদুষ্পর্শে ঘুমন্ত, পদানত বাঙালিকে জাগিয়ে তুলে উদ্দীপ্ত করেছিলেন স্বাধীনতার মন্ত্রে। আর তাই আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়। এটি একটি বাস্তব কথা।’ বঙ্গবন্ধু সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে উপলব্ধি করেই ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক ভুল শোধরান। যে হিন্দু ও মুসলিম ভারতে আলাদা হয়ে পড়ে, সেই তাদের সবাইকে একত্র করে এক অখণ্ড বাঙালি জাতিকে পরিণত করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধু তাই আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক এবং বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু অভিন্ন সত্তা।
৫.
হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি মহাকালের মহানায়ক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী এবং দিনটি শিশু দিবস হিসেবে বিশেষ আয়োজনে পালিত হচ্ছে। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন বলে এই দিনটাকে ঘোষণা করা হয়েছে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর বয়স হতো এখন ১০০। কিন্তু এটা বড় দুঃখের বিষয় যে, মাত্র ৫৫ বছর বয়সে, এক ষড়যন্ত্রের ফলে তিনি সপরিবারে নিহত হন। যাদের জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করে তিনি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদেরই কয়েকজন বিপথগামী তাকে এবং তার পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সাহস, দূরদৃষ্টি, উদারতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ যে ব্যক্তিটি সেই শেখ মুজিব, বাংলার বন্ধু, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের বন্ধু, বঙ্গবন্ধু, মহাকালের মহানায়কের জন্মদিনে কোনো কেক কাটা হবে না। কোনো আনন্দ-ফুর্তি হবে না। জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হয়। জাতির জনকের প্রতি আবারো সশ্রদ্ধ অভিবাদন। জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু বা তাঁর পরিবার কখনো তাঁর জন্মদিন পালন করতেন না। বস্তুতপক্ষে বঙ্গবন্ধু যে সময় জন্মেছিলেন, যখন তিনি একজন রাজনৈতিক কর্মী বা নেতা অথবা জাতির জনক তখন মধ্যবিত্ত বাঙালিদের মধ্যে জন্মদিন পালন করার তেমন একটা রেওয়াজ ছিল না। একাত্তরের উত্তাল মার্চে যখন সারা বাংলাদেশে এক দমবন্ধ হওয়া পরিবেশ, তখন কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে ১৭ মার্চ তাঁর ৫২তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার জন্মদিনই বা কী আর মৃত্যু দিনই বা কী!’ সে সময় বঙ্গবন্ধুর এই বাক্যটি ‘দৈনিক আজাদ’ ও ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকা বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছিল। আসলে বঙ্গবন্ধুর কত জন্মদিন যে কারাগারে কেটেছে তার হিসাব করা মুশকিল। এখন দিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালিত হয়। বঙ্গবন্ধু শিশুদের অসম্ভব ভালোবাসতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে খুব কম অনুষ্ঠান হয়েছে, যেখানে তাঁর সঙ্গে শিশু রাসেল সঙ্গী হয়নি। মাঝে মধ্যে বিদেশেও বঙ্গবন্ধু রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন। তাঁর বাকি চার সন্তান এই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কারণ তাঁরা যখন বড় হচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু হয় কোনো না কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন অথবা কারাবন্দি ছিলেন। পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনকালে তিনি ১৮বার জেলে গেছেন, মোট সাড়ে ১১ বছর জেলে কাটিয়েছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন অন্তত দু’বার। বেঁচে থাকলে এই মার্চের ১৭ তারিখ তাঁর ৯৯তম জন্মবার্ষিকী হতো। তিনি আজ আমাদের মধ্যে নেই, আর পাঁচ-দশটা জন্মদিনের মতো এই দিনটি ঘটা করে তাঁর পরিবারের কেউ হয়তো পালন করবে না কিন্তু জাতি আজ শ্রদ্ধাবনতচিত্তে তাঁকে স্মরণ করবে। কারণ তিনি বাঙালিকে তার হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন। তিনি আজ শুধু একজন শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু বা জাতির জনকই নন, তিনি বাঙালির জন্য মহাকালের মহানায়ক। এমন একজন মহানায়কের জন্য বাঙালিকে হয়তো হাজার বছর অপেক্ষা করতে হবে। আজকের দিনটিতে মহানায়কের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। প্রয়াত মহানায়কের প্রতি জন্মদিনের ভালোবাসা।
৬.
বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন। বঙ্গবন্ধু একটি পতাকা, একটি মানচিত্র, একটি দেশ, বাঙালি জাতীয়তার একটি মহাকাব্য, একটি আন্দোলন, জাতি নির্মাণের কারিগর, ঠিকানা প্রদানের সংগ্রাম, একটি বিপ্লব, একটি অভ্যুত্থান, একটি ইতিহাস, বাঙালি জাতির ধ্রুবতারা: জাতির উত্থান–রাজনীতির কবি, জনগণের বন্ধু, রাষ্ট্রের স্থপতি, স্বাধীনতার প্রতীক, ইতিহাসের মহানায়ক, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বিবিসি বাংলা বিভাগের জরিপে বঙ্গবন্ধুকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলা হয়। কিন্তু আমরা ৭ কোটি বাঙালি ১৯৭০-৭১ সালেই সেই রায় দিয়ে দিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার বন্ধু নন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বিবিসি বঙ্গবন্ধুকে পুনঃ আবিষ্কার করেছে মাত্র। মনে পড়ছে, দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা সম্পর্কে কোনো এক কবি লিখেছিলেন, তাঁর নাম ও পরিচয়ের কোনো দরকার নেই তিনি মানেই আফ্রিকা আর আফ্রিকা মানেই মেন্ডেলা। এই একই কথাটি প্রযোজ্য আমাদের মহান নেতা, মুক্তিযুদ্ধের পথপ্রদর্শক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও। কেননা তাঁর নাম ও পরিচয়ের আসলেই কোনো দরকার নেই কারণ তিনি মানেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট (১৯৭২ সালের এক সাক্ষাৎকারে) বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনার শক্তি কোথায়? তিনি অপকটে সে প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি’। সাংবাদিক আবারো জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার দুর্বল দিকটা কী? বঙ্গবন্ধু সে প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি’। বঙ্গবন্ধু বলতেন, তার প্রধান গুণ এই যে, নিজের দেশের মানুষকে তিনি ভালোবাসেন, আর তার প্রধান দুর্বলতা এই যে, তিনি তাদের বড় বেশি ভালোবাসেন। তাদের কেউ কখনো যে তাকে মেরে ফেলতে পারে, এ কথা কখনো তার মনে আসেনি। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, সেই অভাবিত ঘটনাই ঘটেছিল। মৃত্যুর মুহূর্তেও তিনি ভয় পাননি। খুনিরা যখন তাঁকে মারতে গেল, তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাদের মুখোমুখি হয়ে জানতে চেয়েছিলেন ‘কী চাস তোরা? তারা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল। তার কথার জবাবে তারা তাকে লক্ষ্য করে বর্ষণ করেছিল গুলির পর গুলি। এই অদম্য সাহস ছিল শেখ মুজিবুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। মানুষ বড় হয় নিজের গুণে। সব মানুষের সব গুণ থাকে না, তবে কিছু কিছু গুণই মানুষকে অনেক বড় করে তুলতে পারে। সকলেই চেষ্টা করলে কিছু না কিছু গুণের অধিকারী হতে পারে। যেসব গুণ তাকে জীবনের প্রতিষ্ঠা দিতে পারে। প্রতিষ্ঠা যদি নাও দেয়, তার জীবনকে সার্থক করতে পারে। তার মনকে তৃপ্তি দিতে পারে। সেটি কম কথা নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও এমন অনেক গুণের কথা জানতে পারি আমরা। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ভাষায়, ‘এত বড় যোদ্ধা একজন মানুষ, কিন্তু কী বিনয় ছিল কথাবার্তায়, চালচলনে! আইয়ুব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার নামের শেষে ‘সাহেব’ জুড়ে দিতেন। বলতেন, ইয়াহিয়া সাহেব, এত অহংকারী হবেন না। এই সাহেব ডাকে কিছুটা কৌতুক ছিল, ঠাট্টা ছিল, কিন্তু সৌজন্যও ছিল। তাঁর ভাষা ছিল শাণিত, ইস্পাতের ফলার মতো। কিন্তু মার্জিত। প্রতিপক্ষ যে-ই হোক, একটা সৌজন্যবোধ তিনি তাকে দেখাতেন।’
৭.
বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, সেই প্রক্রিয়ায় পথ চলতে জানতে পারি এই ভারতীয় উপমহাদেশটাই ছিল ব্রিটিশের উপনিবেশ। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যাঁরা আন্দোলন করেছেন, অর্থাৎ স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, এ রকম মানুষের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন একটা প্রক্রিয়া চলেছে। সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সবাই কিন্তু এভাবে একটি সাধারণ নেতৃত্বের পর্যায় থেকে একেবারে মহান নেতার পর্যায়ে পৌঁছেছেন। বঙ্গবন্ধুও তা-ই। সর্বোপরি এ দেশের দুখী-দরিদ্র মানুষের জন্য তাঁর নিরন্তর ও নিরলস সংগ্রাম এবং দাবি আদায়ে দীর্ঘ কারাবাসের মুখে দৃঢ় মনোবল তাঁকে করে তুলেছিল জীবন্ত কিংবদন্তি। ফলে আক্ষরিক অর্থেই ‘রাজনীতিতে আদর্শ ও মূল্যবোধের চর্চায় এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু। ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে যেমন জানতে হবে তেমনি তার জীবনী থেকে বর্তমান যুগের রাজনীতিবিদদের অনেক কিছু শেখার আছে।’ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু একে ওপরের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে কল্পনা করা যায় না। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার প্রতীক ও খাঁটি দেশপ্রেমিক। তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের জন্য অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলার জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত কিন্তু তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। এমনকি, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে অংশটি পাকিস্তানের সঙ্গে আপসরফা করতে চেয়েছিল, তারাও বলতো, বঙ্গবন্ধুর প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টাই তারা করছে। তাদের সে প্রয়াস সফল হয়নি। বাংলাদেশ মুক্ত হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক চাপে স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান।
৮.
পৃথিবীতে কিছু রাজনীতিবিদ আছেন যাদের নামের সঙ্গে তার দেশ একাত্ম হয়ে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা, চিনে মাও সেতুং, রাশিয়ায় লেনিন, ভিয়েতনামে হো চি মিন, তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক, যুগোশ্লাভিয়ায় মার্শাল টিটো আর বাংলাদেশে শেখ মুজিব। এসব দেশের নাম আসলে অবধারিতভাবেই এসব ব্যক্তির নামও আসে। এসব ব্যক্তির দীর্ঘ সংগ্রাম ও বিপ্লব, ত্যাগ এবং আপসহীন মানসিকতার কারণেই পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে দেশগুলো। মৌলিক জায়গায় মিল থাকলেও এদের একেকজনের ভূমিকা একেক ধরনের। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের ব্যপ্তি ও বৈশিষ্ট স্বতন্ত্র। বাঙালি এমন এক জাতি যারা বারবার পরাধীন ছিল। কখনও ব্রিটিশ, কখনও মুঘল আর সর্বশেষ পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা শোষিত হয়েছে তারা। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি শাসনের বাস্তবতা মেনেই। কিন্তু ভারত ভেঙে পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি যখন দেখলেন ধীরে ধীরে কেড়ে নেয়া হচ্ছে বাঙালির অধিকার, চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে শোষণ-বঞ্চনার জগদ্দল পাথর, তিনি অন্যভাবে চিন্তা করলেন। তার সুপ্তচিন্তা স্বাধীন বাংলাদেশের সত্তা আস্তে আস্তে প্রসারিত হতে শুরু করল। সে অনুযায়ী তিনি পদক্ষেপও নিতে শুরু করলেন। যার ছাপ আমরা দেখি মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন ও পরে তা ভেঙে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা এবং ছয় দফার ঘোষণায়। তার লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল, অটল। তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা একে একে অনেকেই তাকে ছেড়ে যান। কেউ কেউ ভিন্ন দল গঠন করে তার বিরোধিতাও করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পিছ পা হননি। সে অর্থে তাকে প্রথমে লড়তে হয়েছে তার রাজনৈতিক সহযাত্রীদের সঙ্গেই। আর পরে পাকিস্তানিদের সঙ্গে। ঘরের শত্রুদের জয় করেই বাইরের শত্রুদের তাড়াতে হয়েছে তাকে। এর আরও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখা যায়, যখন ছয় দফার প্রশ্নে তার নিজ দলেই বিভেদ তৈরি হয়। জাতির পিতা তার আত্মজীবনীতে নিজেই লিখে গেছেন সে কথা।
৯.
দেশপ্রেমের পাশাপাশি আইনের প্রতি প্রবল সম্মানবোধের অনেক কথাও জানা যায় তার জীবনীতে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত হৃদয়বান ব্যক্তি। তখন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। পাকিস্তানের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সরকার তার বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গঠনের চেষ্টার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়েছে। এ মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজনের ভাষ্যে জানা যায়, তারা এবং তাদের কাছের-দূরের অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন ‘ফাঁসি নিশ্চিত’। আর এ মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান তখন স্ত্রী রেনুর অনুরোধে তারই দেওয়া ডায়েরিতে রাজনীতি, সমাজ জীবন, পরিবার, ভারতবর্ষের বিভাজন, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা- কত কিছুই না লিখে রাখছেন। তাজমহলের কথা লিখতে গিয়ে তার নিশ্চয়ই প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা বিশেষভাবে মনে এসেছিল। এ গ্রন্থেরই আরেক স্থানে লিখেছেন, ‘আব্বাসউদ্দিন সাহেব যখন ভাটিয়ালি গান আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, ‘নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী: পৃষ্ঠা-১১১)। তিনি আরেক স্থানে লিখেছেন, ‘জেলখানায় আমি ফুলের বাগান করতাম। তাদের (আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী আফিয়া খাতুন) দেখা হবার দিনে (জেলগেটে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের সময়) ফুল তুলে হয় ফুলের মালা, না হয় তোড়া বানিয়ে দিতাম।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী : পৃষ্ঠা- ১৬৯)। এত মানবিক! এমন না হলে যে জাতির পিতা হওয়া যায় না! তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে’ দেখি বড় বড় মানুষের কথা বলার পাশাপাশি তিনি অজ্ঞাত, অখ্যাত মানুষের কথা লিখে রেখেছেন। একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। পূর্ব পাকিস্তানে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। মুসলিম লীগ হেরে গেছে। যুক্তফ্রন্টের নেতা এ কে ফজলুল হক মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু পাকিস্তানের সরকার অন্যায়ভাবে সে মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে দিল, শেখ মুজিবকে ধরতে পুলিশ গেল তার বাড়িতে। তিনি তখন ঘরে ছিলেন না, সব জেনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন করেন মুজিব। বললেন, আমার বাড়িতে পুলিশ এসেছিল, বোধহয় আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। আমি এখন ঘরেই আছি, গাড়ি পাঠিয়ে দিন। পুলিশ এসে তাকে নিয়ে গেল। আরেকটি কথাও বলতে হয় সেইসঙ্গে- তার মানবিকতার কথা। যখন পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেছেন, তখন হিন্দু-মুসলমানে খুব বড়ো দাঙ্গা। শেখ মুজিব তখন কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজের ছা্ত্র। কলেজের হিন্দু অধ্যাপক যেন নিরাপদে মুসলমান পাড়া পার হয়ে যাওয়া-আসা করতে পারেন সে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে। তখন বিপদগ্রস্থ মুসলমান নরনারীকে যেমন উদ্ধার করেছেন, তেমনি বিপন্ন হিন্দুদেরও রক্ষা করেছেন। ১৯৬৪ সালে পূর্ব বাংলায় আরো একবার সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হল। শেখ মুজিব ঝাঁপিয়ে পিড়েছিলেন তা থামাতে। সবাইকে নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খিস্ট্রানকে তিনি আলাদা করে দেখেননি, সকলকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তিনি যে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেখানে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার।
১০.
ইতিহাসের পাঠ থেকে আমরা জানি, মধ্যযুগে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন সুলতান হিসেবে বাংলাদেশের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু ইলিয়াস শাহ বাঙালি ছিলেন না। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম নৃপতি। বাঙালিদের স্বাধীন ভূমি এনে দেওয়ার প্রয়াস ছিল অনেক বাঙালি নেতারই এবং বাঙালিকে ভালোবেসেছিলেন অনেক জননেতাই। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষ বসু, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের অবদান বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয়। বাঙালিরাও তাদের আর নাম ধরে ডাকে না। বলে থাকে ‘দেশবন্ধু’, ‘নেতাজী’, ‘শেরে বাংলা’ নামে। তবে ‘বঙ্গবন্ধু’র সব খেতাবকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে স্থান লাভ করেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণের অন্য নাম ‘বজ্রকণ্ঠ’। এ কণ্ঠ কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষকেও। তাই বিশ্বের বড়ো বড় জননেতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। বিশ্ব বিখ্যাত নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অনন্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের ৩ থেকে ২৫ মার্চের কালরাত্রি পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ দিন ধরে তার সফল নেতৃত্বে মূলত যে অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন হয়েছে তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। সমগ্র জাতি সেদিন পাকিস্তান সরকারের আদেশ নিষেধ এমনকি সামরিক ফরমান অমান্য করে বঙ্গবন্ধুর অঙ্গুলি হেলনে উঠত বসত। বিশ্বের গণতান্ত্রিক নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। সমগ্র জাতি ছিল তার মোহগ্রস্ত। ৭১-এর ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে যুগান্তকারী অলিখিত ভাষণ তিনি দিয়েছিলেন সে ভাষণে বাঙালি জাতির সম্পূর্ণ দিকনির্দেশনা ছিল যাতে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘মুক্তির’ কথা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তিনি ঘোষণা করেন। এ ধরনের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর মতো বিরল ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের পক্ষেই সম্ভব। বিশ্ব বরেণ্য সাংবাদিক ও ঐতিহাসিক কর্তৃক স্বীকৃত ও নন্দিত এ ভাষণ পৃথিবীর অন্যতম ভাষণের মধ্যে প্রধান।
১১.
বঙ্গবন্ধু গবেষক শামসুজ্জামান খানের মতে, শেখ মুজিব বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নের এবং অন্তরের অন্তস্থলে গুমরে মরা স্বাধীনতার আকাংখার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এবং বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন। তার চেয়ে প্রতিভাবান ও বগুগণে গুণিান্বিত বাঙালি অনেকেই ছিলেন; তবু তিনিই নানা কারণে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও আধুনিক রাষ্ট্রসত্তার অধিকারী বাঙালি জাতির জনক। ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান যে নবরাজনৈতিক জাতির ‘জাতির পিতা’ তার তাত্ত্বিক ভিত্তির জন্য আমরা এই বিষয়ের শ্রেষ্ঠ ভাবুক জার্মান দার্শনিক হেগেলের শরণ নিতে পারি। হেগেল বলেছিলেন, ‘Man owes his entire existence to the state and has his being within it alone.’ তিনি আরো বলেন, ‘The Great man of the age is one who can put into words the will of his age, tell his age, what its will is, and accomplish it. What he does it the heart and essence of his age, he actualise his age’ (Philosophy of Rights গ্রন্থের অংশ)। হেগেলের মতানুসারে শেখ মুজিব তার যুগের ইচ্ছা ও এষণাকে (Will of his age) বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন ( Actualize of his age) । তাই তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি এবং বাঙালি জাতির জনক। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে কয়েকশ বছরে যে বাঙালি জাতি গড়ে ওঠে তা ছিলো একটি নৃগোষ্ঠী (Race) মাত্র। একই ভাষা ও সাধারণ আর্থ-সামাজিক জীবনধারার বিকাশের ফলে এবং শারীরিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক গড়নের সাযুজ্যে এ নৃগোষ্ঠী স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও বহু ক্ষেত্রের নানা মনীষীর স্ব স্ব ক্ষেত্রে চিন্তার নব নব বিন্যাসে একটি উন্ন জনগোষ্ঠীতে (Community) পরিণত হবে। প্রায় তিন দশকের সাধিকার ও সুপরিকল্পিত স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তা একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। এই জাতিরই মূল স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসের গতিধারায় রাজনৈতিক উত্তুঙ্গ মুহুর্তের (Momentum ) সৃষ্টি করে তাকে বাস্তবায়িত করার কৃতিত্ব শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সুযোগ্য ডেপুটি তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য রাজনীতিবিদদের।
১২.
আমরা জেনেছি, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক সম্ভ্রান্ত শেখ বংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম ছিল শেখ লুৎফর রহমান, মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। তাঁর পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন গোপালগঞ্জ দেওয়ানি আদালতের সেরেস্তাদার। মুজিব ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। তিনি স্থানীয় গীমাডাঙ্গা স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। চোখের সমস্যার কারণে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা চার বছর ব্যাহত হয়। ১৯৪২ সালে তিনি গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.এ এবং একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বি.এ পাশ করেন। তিনি ছোট বেলা থেকেই ছিলেন সাহসী এবং সংগ্রামী। নিজের চোখে দেখেছেন বৃটিশদের শোষণ-নির্যাতন। এর পর পাকিস্তানীদের শোষণ-নির্যাতন, নিপীড়ন। এই শোষণ-নির্যাতন, নিপীড়ন দেখতে দেখতে মানুষের মুক্তির জন্য সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি হয়ে উঠেন সাধারণ থেকে অসাধারণ মহানায়ক বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত বিভাজন আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। প্রাচীন বাঙালির আধুনিক স্থপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের জাতির জনক বা জাতির পিতা বলা হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম এদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বাঙালি স্বাধীনতা প্রিয় জাতি। মুক্ত বিহঙ্গের মত জীবনযাপনে অভ্যস্ত বাঙালি কখনও কারো অধীনে থাকেনি। বাঙালি আর স্বাধীনতা- এ যেন একে ওপরের পরিপূরক। হাজার বছরের বাঙালির এই স্বপ্ন-পুরাণ কে সার্থক করে করে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সঙ্গত কারণে তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির জনক শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ও আদর্শে উদ্ধুদ্ধ হয়ে লাখো বাঙালি জীবন বিসর্জন দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছে। সর্বোচ্চ ত্যাগী পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের ও সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক, সর্বোপরি বাঙালিদের প্রকৃত ও অকৃত্রিম বন্ধু বঙ্গবন্ধু।
১৩.
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনধারাকে বোঝার জন্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়াও সমকালীন আর কোন আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক উপাদানের রসায়নে তার মানস গঠিত হয়েছিলো তার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের বড় ছেলে শেখ মুজিবকে মা-বাবা আদর করে ডাকতেন খোকা বলে। কে জানত সেই খোকাই একদিন বদলে দেবেন এই উপমহাদেশের মানচিত্র! সে সময় বাঙালি সমাজে বাল্যবিয়ে বেশ প্রচলিত ছিল। শেখ মুজিবের বয়স যখন ১৩ তখন তাঁর সঙ্গে তিন বছর বয়সী তাঁর চাচাতো বোন ফজিলাতুননেসার বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়। এই খবর তিনি শুনেছিলেন মুরব্বিদের কাছে। ফজিলাতুননেসা পরবর্তীকালে বেগম মুজিব। বঙ্গবন্ধু আদর করে ডাকতেন রেণু বলে। এক অসাধারণ মহিলা। তিনি শত প্রতিকূল অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধুর কাছে থেকে তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন। ফজিলাতুননেসা পাঁচ বছর বয়সে তাঁর পিতা-মাতা উভয়কেই হারান। শেখ মুজিবের মা সায়েরা খাতুনই তাঁকে লালন-পালন করেন নিজের সন্তানের মতো। টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিব শৈশবে ছিলেন বেশ ডানপিটে। পাড়ার উঠতি বয়সের ছেলেরা ডাকত মুজিব ভাই বলে। দূরন্ত বালক হলেও স্কুলের শিক্ষকদের তিনি বেশ সম্মান করতেন। স্কুলজীবনে হামিদ মাস্টার সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য শুনে বোঝা যায় তিনি তাঁকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন।
১৪.
শেখ মুজিবের জীবনধারাই গড়ে উঠেছিল এমনভাবে, যেটা গোপালগঞ্জের সাধারণ গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু হয়ে একেবারে কলকাতা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তিনি বেড়ে উঠেছেন টুঙ্গিপাড়ার গ্রামীণ জীবনপ্রবাহের মধ্যে। নদীনালা, নিসর্গ, দু:খদৈন্যপীড়িত মানুষ, আর নিস্তরঙ্গ সামাজিক জীবনই ছিলো টুঙ্গিপাড়ার বৈশিষ্ট্য। এই জীবনের মধ্যেই ইংরেজ শাসনের প্রতাপ, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বদেশী আন্দোলন, নেতাজী সুভাষ বসুর বীরত্বব্যঞ্জক রাজনৈতিক আবির্ভাব কিশোর শেখ মুজিবকে নানাভাবে স্পর্শ করে, মনকে উদ্দীপ্ত করে। ছোটবেলায় বেরিবেরি ও চোখের অসুখের কারণে তার শিক্ষা জীবনের প্রায় চারটি বছর সময় নষ্ট হয়। ফলে বেশি বয়সে তিনি স্কুল জীবন শুরু করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের জন্য এটা বেশ সহায়ক হয় বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। তার জীবনীকারদের মতে, রাজনৈতিক বোধ, আগ্রহ আর কৌতুহলে তিনি ছিলেন অন্যান্য ছাত্রদের চেয়ে অগ্রগামী। সেই সুবাদে পিতার কর্মস্থল মাদারীপুরে ইসলামিয়া হাইস্কুলে পড়বার সময়েই তিনি নেতাজি সুভাষ বসুর রাজনীতির প্রতি বেশ আকৃষ্ঠ হন। তের-চৌদ্দ বছরের তিনি স্থানীয় স্বদেশী দলের সাথেও যুক্ত হন। সেই সময়কার মাদারীপুরের বিখ্যাত স্বদেশী অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাসের প্রতিও অনুরক্ত হয়ে ওঠেন শেখ মুজিব। বিশেষ করে কবি কাজী নজরুল ইসলাম কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়া এই বিপ্লবীকে অভিনন্দন জানিয়ে ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ শীর্ষক কবিতায় তাকে মাদারীপুরের ‘মর্দ-বীর’ বলে অভিহিত করলে তিনি বিশেষভাবে উদ্দীপ্ত হন, তার রাজনৈতিক মনোভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তীকালে তারই দেখা পাই, সেই কবিতারই অংশ ‘জয় বাংলা’ বীজমন্ত্রের শব্দ ব্যবহারই মুজিবের উদ্দীপনাকে প্রমাণ করে। আবার নজরুলেরই অন্য কবিতায় ব্যবহৃত ‘বাংলাদেশ’ শব্দটিও বোধকরি শেখ মুজিবের অন্তরে মুদ্রিত হয়ে গিয়েছিলো। কারণ মাটির মানুষ মুজিবের সাথে আশৈশব ছিলো গ্রামের, গ্রামের স্কুল, গ্রামের মানুষ, গ্রামের লোকজনের সঙ্গে গভীর সুসম্পর্ক। তাদের ভালো, মন্দ-সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়া ছিলো আজন্মের স্বভাব। এসবের মধ্য দিয়েই তার মধ্যে একটা যোগ্য নেতৃত্বের বিকাশ-প্রকাশ ঘটতে দেখি। আর সেটারই একটি মার্জিত রূপ ধারণ করে, যখন মহানগরী কলকাতায় লেখাপড়ার জন্য গিয়ে সেখানকার ছাত্র আন্দোলনে তিনি নি:স্বার্থৃভাবে আত্মনিয়োগ করেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকতে থাকতে যে যোগ্যতা ও গুণাবলি গড়ে উঠেছিলো, তার একটা পরিশীলিত অর্থাৎ নাগরিক চরিত্রের রূপ তাঁর মধ্যে আসতে থাকে, বৃদ্ধি পায়। এভাবেই তিনি মানবিক বোধের জাগরণে নেতৃত্বের আলোর সিঁড়ি বেয়ে আপন যোগ্যতায় উচ্চস্তরে উঠে আসেন অন্যদের ছাপিয়ে। এসবের মাঝে বেড়ে ওঠার ফলেই তার মতোন মানবিক ও প্রখর সমাজ সচেতন একজন মানুষের মধ্যে যে চিন্তা-ভাবনা, চেতনা, কর্ম এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করে; জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে এক কাতারে নিয়ে সার্থক প্রতিনিধিরূপে আবির্ভূত হন এমন মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করেন, ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেন। আবার ইতিহাসের প্রয়োজনে কোনো কোনো মানুষের আবির্ভাব ঘটে। মুজিবের জন্ম ইতিহাসের প্রয়োজন হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই তারুণ্যদীপ্ত কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। তরুণরাই পারে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে।
১৫.
পিতার চাকুরির বদলির সুবাদে ১৯৩৭ সালে মুজিব মাদারীপুর থেকে গোপালগঞ্জ মিশন হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সে সময়কার তার গৃহশিক্ষক সক্রিয় স্বদেশী নেতা হামিদ মাস্টারের প্রভাবও বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। ছেলেবেলায় বারবার অসুখে ভোগার কারণে তার পড়াশোনার সময় অনেকটা নষ্ট হয়েছিল। এজন্য তিনি লেখাপড়ার সহপাঠীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েন। তবে খেলাধুলায় তার খুব মন ছিল। ফুটবল, ভলিবল ও হকি খেলতেন। স্কুলে টিমে তার জায়গাটা ছিল পাকা। তার আব্বা ছিলেন গোপালগঞ্জের অফির্সাস ক্লাবের সেক্রেটারি। তার দলের বিরুদ্ধে শেখ মুজিব স্কুলের টিম নিয়ে ফুটবল খেলে এক গোলে হেরেছেন, কিন্তু পিতাকে মাঠ ছেড়ে দেননি। সেটিও খুব বড় কথা নয়। বড় কথা তাঁর চিরকালের সাহস। ছেলেবেলা তেকে তিনি ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। একবার এক মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। আরো আরেকজনের সঙ্গে তার বিরুদ্ধেও মামলা হয়। তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বের হয়। তার ফুফাতো ভাই পরামর্শ দিলেন পাশের বাসায় গিয়ে সরে থাকতে। মুজিব বললেন, আমি পালাব না, লোকে বলবে আমি ভয় পেয়েছি। বাড়ি থেকে তাকে ধরে নিয়ে গেল। জেলহাজতে থাকতে হল সাতদিন। তারপর জামিন হল। তখন তিনি স্কুল ছাত্র।
১৬.
১৯৩৮ সাল শেখ মুজিবের জীবনে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে আলোচিত। সে বছর গোপালগঞ্জে সফরে আসেন হক-লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীসভার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হক এবং তার বাণিজ্য ও শ্রমমন্ত্রী এবং জনপ্রিয় মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই সফরে মুজিবের সাহস ও সপ্রতিভতার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী সম্ভাবনাময় এক তরুণের সন্ধান পান। এই প্রতিভাবান তরুণকে তিনি বাংলায় মুসলীম লীগ গড়ে তোলা এবং পাকিস্তান আন্দোলনে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে তার সঙ্গে সংযোগ রক্ষার দায়িত্ব দেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সোহরাওয়ার্দী ১৯৪০-৪১ সালের মধ্যেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক গুরুতে (মেন্টর) পরিণত হন। আমরা জানি, অবিভক্ত ভারতবর্ষে পূর্ব বাংলার পড়ালেখা, রাজকর্ম, আইন-আদালত, আনন্দ-বিনোদন সবই ছিল অনেকটা কলকাতাকেন্দ্রিক। বঙ্গবন্ধু মাদারীপুরে স্কুলজীবন শেষ করে ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ)। সেখানেই তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি, যদিও স্কুলে পড়ার সময় ফরিদপুর-মাদারীপুরের অনেক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর নেতা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক (তাঁর সঙ্গে অনেক বিষয়ে তাঁর মতপার্থক্যও ছিল)। কলকাতায় তরুণ শেখ মুজিব নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেছেন। হলওয়েল মনুমেন্ট ভাঙায় গাঁইতি চালিয়েছেন। আবার জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ফলে কলকাতায় ভয়াবহ দাঙ্গার সূত্রপাত হলে তিনি সেই দাঙ্গায় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে ক্ষতিগ্রস্তদের তাঁর সতীর্থদের নিয়ে সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি রাজপথের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। মুসলিম লীগের নেতাদের সঙ্গে গ্রামগঞ্জে ঘুরেছেন। অন্যদিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশের স্বাধীন বাংলা সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে একাত্ম ছিলেন। কিন্তু নানা ঐতিহাসিক কারণে সেই ধারণা বেশি অগ্রসর হয়নি। আবার পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার রেশ না কাটতেই শেখ মুজিব বুঝে গিয়েছিলেন সৃষ্ট পাকিস্তানে বাঙালিদের জন্য কোনো সুখবর নেই। ১৯৪৮ সালেই গঠন করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। যা বস্তুতপক্ষে সেই সময়ের পাকিস্তান সরকার ও মুসলিম লীগবিরোধী প্রথম সংগঠন। এর এক বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। আমরা তার জীবনী থেকে জানি, ১৯৫৩ সালে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৬৬ সালেই তিনি দলের সভাপতি হন। দলকে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র দেওয়ার জন্য ১৯৫৫ সালে মুজিবের উদ্যোগে দলের নাম হতে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালের পর রাজনীতিতে তাঁর যে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটেছিল এ ছিল তারই প্রতিফলন।
১৭.
দেশভাগের পর কলকাতা থেকে তাঁর ঢাকায় আগমন ঘটে। ঢাকায় এসে মুসলিম লীগের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত হন। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন, ঢাকায় এসে তাঁদের প্রথম কাজই ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন করা। সাম্প্রদায়িকতা একদিকে যেমন সামন্ত-চিন্তার ফসল, অন্যদিকে তেমনি খুবই পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণা, যেটাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান আন্দোলনটা গড়ে উঠেছিল। পাকিস্তানের এই চিন্তাভাবনা, ধ্যানধারণা এবং রাষ্ট্রনীতি, এর বিরুদ্ধে তাঁরা প্রথম আন্দোলন শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুই বলেছেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাঁদের বলেছিলেন, তোমাদের কিছুই করতে হবে না, আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হিন্দু-মুসলমান খুনোখুনি বন্ধ করার চেষ্টা করো। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তোলার চেষ্টা করো। বস্তুত, মধ্যযুগীয় যে ধ্যানধারণা, ধর্মের ভিত্তিতে ভাগাভাগি এবং তারই জন্য লড়াই; তার বিপরীতে নাগরিক জীবনের জন্য রাজনীতির সংগ্রাম, অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে নিজেদের মধ্যে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু ধর্মের কারণে নয়। এটাই শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় ধর্মনিরপেক্ষতা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে। আমরা জানতে পারি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাজে পুরোপুরি আত্মনিয়োগের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের মন্ত্রিসভায় (১৯৫৬-৫৮) মাত্র নয় মাস কাজের পর মন্ত্রীপদে ইস্তফা দেন। ১৯৬৪ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো সাহসিকতা দেখিয়েছেন শেখ মুজিব, যদিও তাঁর রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দী রাজনৈতিক দলগুলিকে নিষিদ্ধ রেখে পাকিস্তানে সাংবিধানিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক মোর্চার ব্যানারে কাজ করার সপক্ষে ছিলেন। পাকিস্তান ধারণাটির ব্যাপারে ইতোমধ্যেই মুজিবের মোহমুক্তি ঘটেছিল। পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদ ও আইনসভার সদস্য (১৯৫৫-১৯৫৬) এবং পরবর্তীতে জাতীয় পরিষদের সদস্য (১৯৫৬-১৯৫৮) হিসেবে তাঁর এমন ধারণা হয়েছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মনোভাবের মধ্যে সমতা ও সৌভ্রাতৃত্ব বোধ ছিল না।
১৮.
বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালিদের অবিসংবাদিত ও একক নেতা। যার কালজয়ী নেতৃত্ব ছিল বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস এবং বহু দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বা নেতৃত্বের চেয়ে ভিন্নতর। ৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী ও স্বাধিকার এবং স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের তিনি ছিলেন পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ নায়ক। তিনি কখনো অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে আবার কখনো কারাগারের বাইরে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করতেন। শেখ মুজিব ছিলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম কারাবন্দীদের একজন (১১ মার্চ ১৯৪৮)। ১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষার প্রশ্নে তাঁর প্রদত্ত ভাষণ ছিল উল্লেখযোগ্য। মাতৃভাষায় বক্তব্য রাখার অধিকার দাবি করে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখানে বাংলায় কথা বলতে চাই। আমরা অন্য কোনো ভাষা জানি কি জানি না তাতে কিছুই যায় আসে না। যদি মনে হয় আমরা বাংলাতে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি তাহলে ইংরেজিতে কথা বলতে পারা সত্ত্বেও আমরা সবসময় বাংলাতেই কথা বলব। যদি বাংলায় কথা বলতে দেওয়া না হয় তাহলে আমরা পরিষদ থেকে বেরিয়ে যাবো। কিন্তু পরিষদে বাংলায় কথা বলতে দিতে হবে। এটাই আমাদের দাবি।’ ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট গণপরিষদে প্রদত্ত আরেক ভাষণে শেখ মুজিব পূর্ববঙ্গের নাম পরিবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তান রাখার প্রতিবাদে যে বক্তব্য রাখেন তাও সমভাবে প্রাসঙ্গিক: ‘স্যার, আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন যে, তারা পূর্ববঙ্গের স্থলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বসাতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়ে এসেছি যে, [পূর্ব] পাকিস্তানের পরিবর্তে আপনাদের পূর্ব [বঙ্গ] ব্যবহার করতে হবে। ‘বঙ্গ’ শব্দটির একটি ইতিহাস আছে, আছে নিজস্ব একটি ঐতিহ্য…’।
১৯.
শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯৪৮-৪৯ সালে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, ওই সময় কিন্তু একটি সংগঠন তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন। সেটা বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাঁরা যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। গণতান্ত্রিক যুবলীগ। এই যুবলীগে অনেকেই ছিলেন। তখন তাঁরা সবাই একটা প্রশ্নেই লড়াই করেছেন- সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ওই সময় দেখা যায়, যুবলীগ শুধু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নয়, আরও অনেক কিছুতে সম্পৃক্ত ছিল। যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল। বঙ্গবন্ধু বারবার উল্লেখ করেছেন, এ দেশের প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার লোকজন যাঁরা ছিলেন, তাঁরা তাঁদের ধ্যানধারণা বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারতেন না, অর্থাৎ মূল বাস্তবতার কাছাকাছি তারা পৌঁছাতে পারতেন না। তিনি বলতে চেয়েছেন, প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার দিক দিয়ে যাঁরা তৎকালীন নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁদের কথাবার্তা, স্লোগান আর কর্মসূচিগুলো মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। কিন্তু যাঁরা আরও নিচের তলা থেকে, অর্থাৎ জনগণের কাছে থেকে ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলন করেছেন, তাঁরাই ওপরে উঠেছেন।
২০.
লাহোর প্রস্তাবে মুসলমানদের দুটো পৃথক রাষ্ট্র দাবি করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে আইনসভার মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের সম্মেলনে তা বদলে একটা রাষ্ট্র করে দেয়া হলো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে দেশের কর্ণধাররা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা একেবারেই ভুলে গেলেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণপরিষদে শায়েস্তা সোহরাওয়ার্দী ইকরামউল্লাহ বলেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ মনে করছে যে, ওই অঞ্চলকে দেখা হবে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে। তার কয়েকদিন পরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করেন বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। মার্চ মাসে দেশের প্রথম বাজেট আলোচনার সময় একাধিক সদস্য পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র স্বার্থের কথা বলেন এবং মাহমুদ হুসেন দেশের প্রদেশগুলোর জন্য ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’ দাবি করেন। এ সত্ত্বেও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, রাষ্ট্রভাষা, নাগরিক অধিকার ও সুশাসনের মতো বিষয়ে দেশবাসীর মধ্যে নানারকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। এসব সংশয় দূর করেই কেবল যথাযথ লক্ষ্যে যাত্রা শুরু হতে পারতো। সেই সম্ভাবনা প্রথম দেখা দেয় ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। শেখ মুজিবুর রহমান এই আন্দোলনের একজন নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করেন এবং সেই সূত্রেই তিনি প্রথমবারের মতো কারাভোগ করেন।
২১.
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শেখ মুজিবের ইতিবাচক নানা ভূমিকার কথা জানা যায় বিভিন্নজনের রচনায়। স্বনামধন্য সাংবাদিক এবং বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব তোয়াব খানের ভাষায়, আওয়ামী লীগের নেতা শামসুল হক ১৯৪৯ সালে প্রথম উপনির্বাচনে জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের মিটিং চলছে, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কি না তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। শামসুল হক সাহেব বারবার বলেছিলেন, আপনারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবেন না, তাহলে ওরা রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবে। তিনি বারবার এটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ওই ছাত্রসভায় আমার যত দূর মনে পড়ে আবদুল মতিন- যিনি ভাষা মতিন নামে খ্যাত- প্রস্তাব দেন, চারজন করে বেরিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করুন। শামসুল হক সাহেবকে সেখানে রীতিমতো অপদস্থ হতে হয়। শেখ মুজিবুর রহমান তখন হাসপাতালে কারারুদ্ধ ছিলেন। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। কিন্তু যে রাজনৈতিক নেতারা এই আন্দোলনের জন্য সর্বদলীয় ভাষাসংগ্রাম পরিষদ করেছিলেন, তাঁরা ওই রাতে আবার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু জেলখানা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান হাসপাতালে থাকা অবস্থায় অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। জনগণ যদি কোনো আন্দোলনে এগিয়ে যায়, তখন কোনো নেতা যদি সেখান থেকে পিছিয়ে পড়েন বা থেমে যান, তাহলে তিনি কিন্তু জনগণের আস্থা হারান এবং নেতৃত্বে থাকেন না। শেখ মুজিবুর রহমান জীবনে কোনো দিন এই ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দেননি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে নানা টানাপোড়েনে একপর্যায়ে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে যাচ্ছিল। সেই টালমাটাল সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্টের পক্ষে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে দাঁড়িয়ে যান। আবার ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর যখন মুসলিম লীগ বা পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী আদমজীতে দাঙ্গা লাগায়, সেই দাঙ্গা প্রতিরোধের জন্য সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন একজন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। অর্থাৎ মানুষের সংগ্রাম ও আন্দোলনের পর্যায়গুলো এভাবে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব শেখ মুজিবের একটি অগ্রণী ভূমিকা সব ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই অগ্রণী ভূমিকার জন্য শেখ মুজিব ক্রমান্বয়ে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত হয়েছেন। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংগ্রামী ছাত্র–জনতা তাঁকে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধুরূপে অভিষিক্ত করেছে। বঙ্গবন্ধু আসলেই বাংলার সাধারণ মানুষের নাড়ির স্পন্দনটা বুঝতে পেরেছিলেন। মুসলিম লীগের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে দুটো বিষয় কাজ করত। একটা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনা এবং তাদের যে দুঃখ, কষ্ট, দুর্দশা; তা থেকে মুক্ত করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সাহসিকতা। অর্থাৎ সাহস করে মানুষকে আন্দোলনের পথে নিয়ে আসা। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে যে সাহস ও দৃঢ় মনোবলের দরকার হয়, সেটা অর্জন করা। এই ক্ষেত্রে দেখা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রনেতা, যুবনেতা এবং তিনিই আওয়ামী লীগের একজন নেতা, যিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সেই সময়কার অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসর ছিলেন। মানুষের কাছেও তিনি দ্রুত পৌঁছে যেতে পারতেন।
২২.
আমরা জানি, স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা ও বিদ্রোহের অপরাধে সেখানে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শুরু হয় গোপন বিচার। কোনো কিছুরই তাঁর দৃঢ়চেতা সংগ্রামী মনোভাবকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালি ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বিজয়ীর বেশে প্রত্যাবর্তন করেন স্বদেশভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে। রাজনীতির গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই ছিলেন পাকিস্তানের জেলে। কিন্তু তাঁর আহ্বানে এবং সেই অর্থে নেতৃত্বে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় উপাদান ছিল বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ। এই এক ভাষণ বারবার প্রচারের মাধ্যমে লাখ লাখ সৈনিক যা করতে পারেনি, তা-ই করা গেছে। অতএব তিনি ছিলেন সেই অর্থে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের সর্বাধিনায়ক। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসার পর গণতান্ত্রিক দেশ গড়ায় তাঁর যে দায়বদ্ধতা, সেটা কিন্তু পরদিন ১১ জানুয়ারিই বোঝা গেছে। তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে নিলেন প্রধানমন্ত্রীর পদ, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো দিন হয়নি। পাকিস্তানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম দিনই গভর্নর জেনারেল হয়েছেন। এটা একটা বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয়ত, এরই সূত্র ধরে বঙ্গবন্ধু বলেছেন যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আমি গণতান্ত্রিক নীতি অনুসরণ করব। এই গণতান্ত্রিক নীতিগুলো ক্ষেত্রে কী কী হতে পারে, সেগুলো বারবারই এসেছে। যেমন নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে কীভাবে হয়েছে- যেভাবে আমাদের এই সমাজব্যবস্থায় সব নির্বাচন হয়। এবং নির্বাচনে ব্যতিক্রমও থাকে। তবে সাধারণভাবে দেখা যায়, নির্বাচনে নানা ‘ফ্যাক্টর’ থাকে, এই ‘ফ্যাক্টরগুলো’ নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে। ব্যতিক্রম ’৫৪ সালের নির্বাচন ও ’৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু অন্য সব নির্বাচনে কোনো না কোনো ‘ফ্যাক্টর’ ছিল।
২৩.
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আত্মনিয়োগ করলেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, নয় মাস ধরে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুয়ায়ী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে ইউরোপে যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল, তার চেয়েও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল বাংলাদেশে। দেশের দুটো বন্দরই ছিল অচল। সব রেললাইন অকেজো। সব সেতু ভাঙা। এই অবস্থায় একটা দেশকে গড়ে তোলা দুরূহ কাজ। এখানে অবধারিতভাবে আর্থিক দৈন্য, খাদ্যাভাব ও সংকট- এগুলো দেখা দেয়। কখনো খাদ্যাভাবে দুর্ভিক্ষও হয়। চীন, রাশিয়ায় এমন হয়েছে। অন্য যেসব দেশে বিপ্লব হয়েছে, সব জায়গারই ছিল এক অবস্থা। খুব স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশেও এমন হওয়ার কথা ছিল; এবং একেবারে যে হয়নি, তা-ও নয়। তবে ’৭২ বা ’৭৩-এ কিন্তু হয়নি। হয়েছে ’৭৪ সালে। কারণ, যে বৃহৎশক্তি পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছে, তারা তখন আর্থিক দিক থেকে বাংলাদেশ যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে, খাদ্যসংকট যাতে দূর না হয়, তার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছে। তারা আসা বন্ধ করে দিয়েছে খাদ্যের জাহাজ। হেনরি কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছিলেন, আমরা তো এক লাখ টন পাঠিয়েছি। আরেক লাখ টন খাদ্য পাঠাচ্ছি। কিন্তু সেই জাহাজ আর আসেনি। এ দেশে এভাবেই বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে।
২৪.
বিশ্ব ইতিহাসে সর্বোচ্চ নৃশংস ও জঘন্যতম বর্বর হত্যাকান্ডের এক নজিরবিহীন যন্ত্রনাকাতর দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট । পাকিস্তান কোনো দিনই চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। চক্রান্ত তারা নানাভাবেই করেছে। ফলে এদেশীয় পাক দোসরদের নির্মৃমতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হয়ে ওঠে বাঙালি ইতিহাসে কালিমাদিপ্ত একটি শোকাবহ দিন। এই দিন বাঙালির বাংলাদেশের স্থপতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যকে হত্যা করেন দেশের কুচক্রী কিছু সেনাসদস্য। কিন্তু দেশের জন্য তাঁর ভালোবাসা আর কালজয়ী নেতৃত্ব যুগে যুগে তাঁকে করে তুলেছে এক অবিসংবাদিত নেতা। তাই তো শৈর্যে, বীর্যে, চেতনায়, নেতৃত্বে বাঙালি আজো তাঁকে স্মরণ করেন শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা এক মহান পুরুষ। তাই তাঁকে স্বাধীনতার প্রতীক বা রাজনীতির কবি খেতাব ছাড়াও নানাভাবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন অনেকে। বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক, এমনকি শত্রুরাও উচ্চকিত প্রশংসা করেছেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ববোধ ও নেতৃত্বের। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে শোষক শ্রেণি, আরেক ভাগে শোষিত। আমি শোষিতের দলে।’ ওই ভাষণের পর কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেছিলেন, ‘তুমি আজ যে ভাষণ দিলে, এখন থেকে সাবধানে থেক। আজ থেকে তোমাকে হত্যার জন্য একটি বুলেট তোমার পিছু নিয়েছে।’ ফিদেল কাস্ত্রোর সেদিনের কথাটিই সত্য হয়ে যায় ঠিক দুই বছরের মাথায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। আর এই খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে বিশ্বসম্প্রদায়। শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার খবরটি শুনে স্তম্ভিত বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘশ্বাসের পাশাপাশি হৃদয় নিংড়ানো মন্তব্য করেছেন। বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন- ‘আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন- ‘শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অনন্যসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিল।’ হত্যাকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরদের একমাত্র অপরাধ ছিল বাংলাদেশের সৃষ্টি। এ কথা যাঁরা বোঝেন না, তাঁদের বোঝাতে চাওয়া বৃথা। যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার চেষ্টা করেন কিংবা আরো বড় করতে গিয়ে ছোট করে ফেলেন, তাঁদের জানতে হবে, ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু অমরতা লাভ করেছেন, তিনি যা তিনি তাই, তাঁর আসন ধূলিমলিন হওয়ার নয়।
২৫.
আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ‘৬৯-এর গণআন্দোলন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কালপর্বটি মহান মুক্তিযুদ্ধের ‘ড্রেস রিহার্সেল’ হিসেবে চিহ্নিত। জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় এবং নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। কিন্তু বাংলার মানুষ এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথ কেঁপে ওঠে এবং ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরী মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহাসমুদ্রে ১০ ছাত্রনেতা প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে স্বৈরশাসকের উদ্দেশে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান করে। সমগ্র দেশ গণবিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ঐতিহাসিক ২৩ ফেব্রুয়ারি সমগ্র বাঙালি জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। কারণ এই দিনটিতে, যে নেতা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই প্রিয় নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করা হয়। সেই সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, মুখপাত্র ও সমন্বয়ক তোফায়েল আহমেদ।
২৬.
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে এক অপ্রতিরোধ্য গতিধারা সঞ্চার করে সর্বক্ষেত্রে বিধস্ত দেশকে পুনর্গঠন করার মহাকর্মযজ্ঞে সর্বোচ্চ সততা ও আন্তরিকতা দিয়ে সমগ্র দেশবাসিকে নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। দশ মাসের মধ্যেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরেপেক্ষতার ভিত্তিতে জাতিকে বিশ্বশ্রেষ্ঠ সংবিধান উপহার দেন। সকল মিল-কারখানা, ব্যাংক ইত্যাদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সবার জন্য সমান অধিকারের ভিত্তিতে এক ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত জাতি-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকল্পে সোনালী স্বপ্নের আবরণে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও উজ্জীবিত করেন। জনতার সংগ্রামের বীর নায়ক হিসেবে তিনি কখনো লক্ষ্যচ্যুত হননি। তাঁর অটল বিশ্বাস ও সুবিবেচিত সিদ্ধান্ত ছিল, যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে। প্রথম জীবনে যে সংগ্রাম শুরু তা পর্যায়ক্রমে উত্তুঙ্গ হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৯ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে তিনি বলেন: ‘১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হলো। সেদিন বুঝতে বাকি রইল না যে বাংলাদেশকে উপনিবেশ করার জন্য বাংলার মানুষকে শোষণ করে গোলামে পরিণত করার জন্য স্বাধীনতা এসেছে। ঢাকায় এসে রাজনৈতিক পরিবেশ দেখে বুঝতে বাকি রইল না যে বাঙালি জাতি শেষ হয়ে গেছে। সেই দিন শপথ নিলাম, বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হবে। ১৯৪৭ সালেই হলো আমাদের সংগ্রামের সূচনা।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামকে সুচিন্তিত পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত করেছেন অনেক চিন্তাভাবনা করে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন: ‘আমি জাম্প করার মানুষ নই। আমি ২৩ বছর পর্যন্ত স্টেপ বাই স্টেপ মুভ করেছি।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে তাঁর এই ‘স্টেপ বাই স্টেপ’-এর একটা পর্যায়ে ১৯৬২ সালে তিনি বলেন: ‘এই দেশ আমার, এই মাটি আমার, এই নদী আমার; এই দেশের সত্যিকার মুক্তির জন্য, এই মাটির আজাদীর জন্য, এই বাতাসকে নির্মল করার জন্য, এই নদীতে জোয়ার আনার জন্য আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করিয়া যাইবে। শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া সম্ভব, কিন্তু এই ফাঁসির রক্তের প্রতি ফোঁটা হইতে লক্ষ লক্ষ মুজিব জন্মগ্রহণ করিয়া সংগ্রাম জোরদার করিবে।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১০ এপ্রিল, চট্টগ্রাম)। যে নেতা কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি, মুচলেকা দিয়ে ভীরুর জীবন যাপন করেননি, তাঁর বক্তব্য তো এমনই হবে।
২৭.
‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ নীতির ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিপূর্ণ অক্ষুন্ন রেখে অসাম্প্রদায়িক ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদের ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান দেশের ইতিহাসে শুধু নয় বিশ্ব মানবাধিকার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এক্ষেত্রেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অবদান যুগে যুগে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ১৮০ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন “আমি নামাজ পড়তাম এবং কোরআন তেলাওয়াত করতাম রোজ। কোরআন শরীফের বাংলা তরজমাও কয়েক খন্ড ছিল আমার কাছে। ঢাকা জেলে শামসুল হক সাহেবের কাছ থেকে নিয়ে মওলানা মোহাম্মদ আলীর ইংরেজি তরজমাও পড়েছি”। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান।’ বাংলাদেশের জনগণকে তিন ধাপে তাঁদের পরিচয় সাজাতে বললেন, আগে মানবতা, তারপর জাতিসত্তা, তারপর ধর্ম। এটাই হলো বঙ্গবন্ধু রচিত বাঙালির বাংলাদেশ উত্থানের, প্রতিষ্ঠার, স্বশাসনের স্বাধীনতার মহাকাব্য। সবাই বাঙালি হয়ে গেল। সাম্প্রদায়িকতার দ্বিজাতিতত্ত্বের আলখাল্লা ফেলে দিল। পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন তাই বঙ্গবন্ধুর এই বিরল কৃতিত্ব কবিতায় প্রকাশ করলেন:
‘শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম–বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান।
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।’
২৮.
শেখ মুজিবের চরিত্র অসংখ্য অনুপম গুণের সমাবেশে গঠিত হয়েছিল। একজন দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে তিনি যতটা বড় ছিলেন তারচেয়েও বড় ছিলেন একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে। পরোপকারী মনোবৃত্তি, পরদুঃখে কাতরতা, সততা, সাহস, নিষ্ঠা, অনমনীয়তা, নির্ভীকতা, উদারতা, দূরদর্শিতা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, দেশপ্রেম, সর্বোপরি বিশ্বমানবতাবোধ তাঁর চরিত্রের প্রধান অলংকার ছিল। তিনি হিংসা বুঝতেন না। তাঁর ঘাতককেও তিনি ক্ষমা করতে পারতেন। একজন সত্যিকারের বীরের সৌন্দর্য হলো ক্ষমা করার গুণ। এই বিশেষ ও মহৎ গুণটি শেখ মুজিবের চরিত্রকে করেছে মহান ও মহিমান্বিত।
২৯.
বঙ্গবন্ধু যে প্রচুর লেখাপড়া করতেন তা তাঁর ভাষণ, বক্তৃতা, চিঠিপত্র আর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকেই টের পাওয়া যায়। বিশেষ করে জেল থেকে তাঁর স্ত্রীকে লেখা চিঠিগুলোতে পরিবারের সদস্যদের লেখাপড়ার ব্যাপারে তিনি প্রায়শই খোঁজখবর নিতেন। পড়ার প্রতি তাঁর একটি অন্য রকম আবেগ ছিল। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতাই তার কণ্ঠস্থ ছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি অপরাহ্নে স্বাধীন বাংলার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু প্রথম যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই ভাষণেও তিনি উদ্ধৃত করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার শেষ দুই পংক্তি- ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, / রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি।’ শুধু কবিগুরুকেই নয়, কবি কাজী নজরুল ইসলামকেও তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। ভারত থেকে নজরুলকে স্বাধীন বাংলাদেশে এনে তিনিই দিয়েছিলেন জাতীয় কবির মর্যাদা। শেখ মুজিব যখন জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন তখন তার শব্দ চয়নেও নজরুলের প্রভাব লক্ষ করা যায়। পৃথিবীর যে ক’জন রাষ্ট্রনায়ক গ্রন্থপ্রেমিক ও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন শেখ মুজিব নিঃসন্দেহে তাঁদের অগ্রগণ্য। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, উইনস্টন চার্চিল, আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, জন এফ কেনেডি, ফিদেল ক্যাস্ত্রো প্রমুখ নেতার গ্রন্থপ্রীতির কথা ও তাদের স্মরণীয় ভাষণ-বক্তৃতার কথা মহাকালের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। সেই সঙ্গে শেখ মুজিবও অমর হয়ে থাকবেন তার অপরিসীম গ্রন্থপ্রেম ও কাব্যিক ভাষণ-বক্তৃতার জন্য। কিন্তু আফসোস হয় বর্তমান রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দেখলে। ছাত্রত্ব ত্যাগ করার পর বেশিরভাগ নেতাকর্মীই (দুই-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া) গ্রন্থমুখী নয়।
৩০.
খোকা থেকে শেখ মুজিবের বঙ্গবন্ধু হয়ে জাতির পিতা হয়ে ওঠার বিষয়ের ইতিহাস জানতে পাঠ ও গবেষণাকালে নানান প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত-গ্রন্থাদি পাই। সময়ের স্বল্পতায় সব কিছু উপস্থাপনা করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজনীতির অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থী হিসেবে জেনেছি একটি আকর গ্রন্থের কথাও। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পাকিস্তান ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ (আইবি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করত। গোয়েন্দা সংস্থাটি তাদের এই পর্যবেক্ষণ সংরক্ষণ করত বঙ্গবন্ধুর নামে খোলা একটি ফাইলে। সেই গোয়েন্দা নথিগুলোর সংকলন নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ শীর্ষক একটি বই। হাক্কানী পাবলিশার্স প্রকাশিত ১৪ খণ্ডের এই সংকলনের প্রথম খণ্ডের মোড়ক উন্মোচনকালে বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথির বক্তব্যে সঠিকই বলেছিলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যে নামটা একেবারে মুছে ফেলে দিয়েছিল…। সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না, সেটাই আজ প্রমাণ হয়েছে। আর এই নাম আজ শুধু বাংলাদেশে না, সারা বিশ্বে আজ উজ্জ্বল। আজকে বিশ্ব ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে। আমি চাইব এ দেশের মানুষ ইতিহাসকে জানবে। ইতিহাসের পথ ধরেই আমরা সামনে এগিয়ে যাব। … তিনি (বঙ্গবন্ধু) যা করে গেছেন তার অনেক কিছুই আমরা এই রিপোর্টের মধ্য দিয়ে পাব। এই রিপোর্টগুলো তাঁর পক্ষের কিছু না। সবই তাঁর বিরুদ্ধের রিপোর্ট। কিন্তু এই বিরুদ্ধের রিপোর্টগুলোর মধ্যে থেকেই আমার মনে হয় আমরা সব থেকে মূল্যবান তথ্য আবিষ্কার করতে পারব। যেমন- কয়লার খনি খুঁড়ে খুঁড়ে তার মধ্যে থেকে হীরা বের হয়ে আসে, হীরার খনি পাওয়া যায়। আমার মনে হয়েছে ঠিক সেভাবেই যেন আমরা হীরার খনি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। বইটি সকলের হাতে তুলে দিতে পারলাম যেন বাংলাদেশের মানুষ সব জানতে পারে।’ উল্লেখ্য, ১৪ খণ্ডের সংকলনে ভাষা আন্দোলন, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তকরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন, আওয়ামী লীগের জন্ম, শেখ মুজিবুর রহমানের চিঠিপত্র, বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ, বক্তব্য-বিবৃতি, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আত্মীয়স্বজন ও নেতাকর্মীদের সাক্ষাতের বিষয়গুলো উঠে এসেছে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে। ১৯৪৮-১৯৫০ সালেই তরুণ রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতায় যে পরিণত হয়েছেন তার প্রমাণ পূর্ব বাংলা ও তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের এই নিরলস ও কঠোরভাবে প্রতিক্ষণ তাঁকে অনুসরণ এবং তাঁর সব কর্মকাণ্ডের অনুপুঙ্খ প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের নজরে আনার প্রয়াস। বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচায় তাঁকে যে গোয়েন্দারা নিবিড়ভাবে চোখে চোখে রাখে-সেই কথা বলেছেন। কিন্তু গোয়েন্দাদের অনুসরণ তৎপরতা যে এত বিস্তৃত ও নিখুঁত তা জানলেও এতটা বিস্তারে বলেননি। তাই এ গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রকাশনা আমাদের জাতীয় ইতিহাস নির্মাণ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বস্তুনিষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনায় ঐতিহাসিক ও গবেষকদের জন্য প্রভূত কাজে লাগছে। আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলের প্রকাশনাকে অভিনন্দন জানাই। এই বইয়ের পরবর্তী খণ্ডগুলো দ্রুত প্রকাশিত হোক, এটাই প্রত্যাশা করি।
৩১.
বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন ছিল গণমানুষের সুখ সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক গভীর মানবিক সংগ্রামী দর্শন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন অনুযায়ী গণমানুষের মুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শেষ পর্যন্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, যেখানে সাংবিধানিকভাবেই ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ (সংবিধান অনুচ্ছেদ ৭)’। এ দর্শনের স্পষ্ট প্রতিফলন হলো তার স্বপ্ন- সোনার বাংলার স্বপ্ন, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটানের স্বপ্ন, শোষণ-বঞ্চনা- দুর্দশামুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস যতদিন থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অম্লান থাকবেন। পৃথিবীর ইতিহাসে, স্বাধীনতার ইতিহাসে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে বঙ্গবন্ধু নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার সঙ্গে। ভালোবাসার সঙ্গে। বাঙালি যতদিন বেঁচে থাকবে, বাংলা ভাষা পৃথিবীতে যতদিন উচ্চারিত হবে বঙ্গবন্ধুর নামও ততদিন ধ্বনিত হবে।
৩২.
রাজনৈতিক নেতা হয়ে ওঠার পথ পরিক্রমায় আমার কাছে বারবার স্পষ্টতর হয় তিনি আমাদের অস্তিত্বের, চেতনার চিরসাথী তিনি শেখ মুজিব বলে, তিনি বঙ্গবন্ধু বলে, তিনি জাতির পিতা বলে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মানে স্ব স্ব অবস্থান থেকে দেশবাসী যথার্থ ভূমিকা পালন করবেন, বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শে নবতর চেতনায় শানিত হয়ে জনগণের কল্যাণে সকলেই নিজেদের নিবেদন করবেন- এটিই আজকের দিনের প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি, যুদ্ধ এখনো চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বুকে নিয়ে, শেখ হাসিনার হাত ধরে, আমরা লড়ে যাব মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত। একটা মহিরুহের মতো ছিলেন মানুষটি, ছায়া মেলে ছিলেন দুর্বলের আর দরিদ্রের মাথার ওপর। সেই ছায়া সরে যাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। তাদের দুর্ভোগ আরও গভীর হয়েছে বৈষম্য বাড়ায়। সম্পদশালীদের অত্যাচার বাড়ায়। আজকের দিনে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর একটা পথ হতে পারে দুর্বল আর দরিদ্রদের এই বন্ধুটিকে মনে রেখে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
৩৩.
মহাকালের আবর্তে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া এ নিয়মের মধ্যেও অনিয়ম হয় কিছু স্মৃতি, গুটিকয়েক নাম। বাংলা ও বাঙালির কাছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটি যেমন। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এ বাঙালির অবদানের পাশাপাশি তার জন্মের তিথিও চিরজাগরুক থাকবে বাঙালির প্রাণের স্পন্দনে। ১৭ মার্চ তাই বাঙালির জন্য আশীর্বাদের একটি দিন। আনন্দের দিনও বটে। এদিন হাজার বছরের শৃঙ্খলিত বাঙালির মুক্তির দিশা নিয়ে জন্ম নিয়েছিল মুজিব নামের এক দেদীপ্যমান আলোক শিখার। এ আলোক শিখা ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে পরাধীনতার আগল থেকে মুক্ত করতে পথ দেখাতে থাকে পরাধীন জাতিকে। অবশেষে বাংলার পূব আকাশে পরিপূর্ণ এক সূর্য হিসেবে আবির্ভূত হয়, বাঙালি অর্জন করে মুক্তি। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আজ নেই, কিন্তু সে সূর্যের প্রখরতা আগের চেয়েও বেড়েছে অনেকগুণ। তাঁর অবস্থান এখন মধ্যগগণে। সেই সূর্যের প্রখরতা নিয়েই বাঙালি জাতি আজ এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। আবারো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মহান স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করছি, তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি রয়েছে আমাদের অসীম ভালোবাসা।

(সহায়ক তথ্যসূত্র: ‘খোকা থেকে মুজিব : বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা’ : আবদুল্লাহ আল মোহন, অন্যধারা প্রকাশনী, বইমেলা-২০২০। ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ : আবদুল্লাহ আল মোহন, তাম্রলিপি প্রকাশনী, বইমেলা-২০২০। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা: শামসুজ্জামান খান, বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা ও বর্তমান বাংলাদেশ : শামসুজ্জামান খান, মহানায়ক: তোয়াব খান, দৈনিক প্রথম আলো, ১৫ আগস্ট ২০১৭, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)

আবদুল্লাহ আল মোহন
১৭ মার্চ, ২০১৯ / ১৭ মার্চ, ২০২০/ ১৫ আগস্ট, ২০২০

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর