Monday, মে ২০, ২০২৪
শিরোনাম

পানির উপরে মাচায় পেঁয়াজের চারা উত্তোলন

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

প্রফেসর ড. মো. আমিন উদ্দিন মৃধা

আমার আজকের লেখার বিষয়বস্তু হচ্ছে কী করে পানির উপরে মাচায় পেঁয়াজের চারা উত্তোলন করা যায়। আপনারা জানেন এই মুহূর্তে পাবনার গাজনার বিল এলাকায় পানিবদ্ধতার কারণে কৃষক ভাইয়েরা নির্দিষ্ট সময়ে জমিতে বীজ ফেলে সহজেই চারা জন্মাতে পারছেন না। ফলে চারার অভাবে নির্দিষ্ট সময়ে পেঁয়াজ চাষ করা সম্ভব হবে না। এতে চাষের সময় পিছিয়ে যাবে এবং প্রকৃত ফলন থেকে কৃষক ভাইয়েরা বঞ্চিত হবেন। আর এতে কৃষকের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও আর্থিক ক্ষতি হবে প্রচুর।

এখানে উল্লেখ করতে চাই যে, মাটিতে সহজেই বীজতলা তৈরি করে চারা জন্মানো যায় কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে মাচায় বীজতলা তৈরিতে কৃষক ভাইয়েরা অতিরিক্ত খরচের পাশাপাশি আরো নানারকম সমস্যার সম্মুখিন হবেন। কিন্তু যে পরিমান খরচ হবে তার চাইতে অনেক বেশি লাভবান হবেন যদি নির্দিষ্ট সময়ে চারা জন্মানো যায় মাচাংপদ্ধতিতে।

এখন আমি বলব একজন কৃষক কী করে খুব সহজেই অল্প খরচে মাচাং তৈরি করবেন। আমরা সবাই বাঁশের মাচাং তৈরি করতে জানি বা দেখেছি। প্রচলিত পদ্ধতিতে আমরা নৌকায় যেভাবে মাচাং তৈরি করি সেভাবেই আমরা বীজতলা প্রস্তুতের মাচাং তৈরি করতে পারি। আমরা একটি বাঁশ থেকে ১০-১৫ ফুট লম্বা করে ৬ বা ৮ টি বাতা তৈরি করব। এ ক্ষেত্রে খরচ কমানোর জন্য বাঁশের বাতা ছাড়াও পাঠকাঠি বা ধঞ্চের কাঠি অথবা তাদের সুবিধামত কোন বিকল্প জিনিসও ব্যবহার করতে পারেন। এরপর বাতাগুলি আমাদের সুবিধামত একসাথে গেঁথে ৩-৪ ফুট চওড়া একটি মাচা তৈরি করে নেব। মাচার উপরে ছোট ছিদ্রযুক্ত মোটা পলিথিন বিছিয়ে দেব। এবার বীজতলার জন্য একটি উপযুক্ত মাটির মিশ্রন তৈরি করে (মাটি, গোবর, সার মিশিয়ে) পলিথিনের উপর ২ ইঞ্চি পুরু করে বিছিয়ে দেব। এর আগে বাঁশের চিকন অংশ বা গাছের শক্ত ডাল কেটে খুটি তৈরি করে পানিতে গেড়ে মাচাংটিকে খুটিগুলির সাথে নির্ধারিত জায়গায় ঝুলিয়ে দেব।এবার কৃষক ভাইয়েরা যেভাবে মাটির বীজতলায় বীজ বপণ করেন ঠিক সেভাবেই এই মাচাংয়েও বীজ বপণ করবেন এবং যত্ন নেবেন। খুঁটির সাথে মাচাং ঝুলানোর পরিবর্তে অন্য ধরনের কাঠামো একইভাবে প্রস্তুত করা যেতে পারে। যেমন আমরা খালি প্লাস্টিকের বোতল (৫ লিটার আকার) মুখ বন্ধ করে মাচাংয়ের চার কোণার নীচে এবং মাঝখানে আটকে দিতে পারি। এই প্রক্রিয়ায় বোতলগুলো মাচাংকে জলের উপর ভাসমান রাখবে। এতে কৃষক ভাইয়েরা যখন প্রয়োজন তখন মাচাং সরাতেও পারবে। তবে চাষের অন্যান্য প্রক্রিয়া একই থাকবে। উল্লেখ্য যে, প্রস্তাবিত প্রযুক্তি বন্যাকবলিত অঞ্চলে ধানের বীজতলা তৈরির জন্য সমানভাবে উপযুক্ত। এছাড়াও এধরণের ভাসমান কাঠামো দেশের বন্যা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে শাকসব্জী জন্মানোর জন্য উপযুক্ত হতে পারে। এই প্রযুক্তি আমাদের উদ্ভাবিত “পানি কৃষি” নামক প্রযুক্তির একটি অঙ্গ। আশা রাখছি ভবিষ্যতে আমরা আমাদের “পানি কৃষি” উদ্ভাবনগুলো বিস্তারিতভাবে জানাবো।

আমি আশা করবো কৃষক ভাইয়েরা এই ধরনের বীজতলা সহজেই তৈরি করতে সমর্থ হবেন। যারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয় তাদেরকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় ব্যাংক থেকে সহজশর্তে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ছাড়াও জনপ্রতিনিধিরা কৃষকভাইদের কোন প্রকার প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যায় কিনা তাও স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায় চেষ্টা করতে পারেন। যে ভাবেই হোক না কেন, কৃষক ভাইদের এই দুঃসময়ে কিভাবে সহযোগিতা করা যায় তা সকলকেই ভাবতে হবে।

আমরা এই পদ্ধতির ব্যবহারের জন্য একটি পরীক্ষামূলক মাচাং ইতোমধ্যেই স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব আহমেদ ফিরোজ কবির মহোদয়ের সার্বিক সহযোগিতায় প্রস্তুত করেছি। আপনারা হাতে কলমে শেখার জন্য চাইলেই আমাদের উদ্ভাবিত পানির উপরে মাচায় পেঁয়াজ চারা উত্তোলন পদ্ধতি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবেন। এছাড়া কৃষক ভাইয়েরা চাইলে আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগও করতে পারবেন।

প্রফেসর ড. মো. আমিন উদ্দিন মৃধা : প্রাক্তন উপাচার্য, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর