Monday, মে ২০, ২০২৪
শিরোনাম

কাহলিল জিবরান : প্রয়াণ দিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

আবদুল্লাহ আল মোহন


‘মানুষ মুলত দুইজন।একজন অন্ধকারে জাগ্রত, অন্যজন আলোর ভেতরে ঘুমন্ত।’- কাহলিল জিবরান
১.
কাহলিল জিবরান কিংবা খলিল জিবরান, আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কসম নাম । তাঁর আরবি নাম জিবরান কাহলিল জিবরান, কাহলিল জিবরান নামেই তিনি সারাবিশ্বে বেশি সুপরিচিত। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, চিত্রশিল্পী, লেখক, ভাস্কর, দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ এবং অঙ্কনশিল্পী। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল নিউইয়র্কে। প্রখ্যাত কবি ও লেখক খলিল জিবরানের প্রয়াণ দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য, কাহলিল জিবরানের জন্ম ১৮৮৩ সালের ৬ জানুয়ারি। ইংরেজী ভাষীদের কাছে ১৯২৩ সালে প্রকাশিত ‘দি প্রফেট’ গ্রন্থের জন্য জিবরান সুপরিচিত। প্রফেট গ্রন্থটি ৪০টিরও অধিক বিদেশী ভাষায় অনুদিত হয়েছে, শেক্সপিয়ারের পর প্রফেট কাব্যগ্রন্থ সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বেস্ট সেলার বই হিসেবে স্বীকৃত।
২.
‘শিল্পকলা হলো প্রকৃতি থেকে অসীমের দিকে যাওয়ার একটা সিঁড়ি।’ – কাহলিল জিবরান
অমর প্রতিকৃতি কাহলিল জিবরান। কত পরিচয় তার ? কবি, দার্শনিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, চিত্রকর, নাট্যরচয়িতা আর সবশেষে সামগ্রিকতায় দার্শনিক একজন, জীবন আর যাপন নিয়ে সুক্ষ দর্শনের রূপকার । জগত আর জীবন মিলে যায়, মিশে যায় একাকার হয় তার অনন্যসাধারণ লেখনীর অক্ষরের রূপায়নে। আরব সাহিত্যে আধুনিকতার অন্যতম রূপকার এই সাহিত্যিক জীবন আর প্রকৃতির নিগূঢ় সব সত্যের এক অনন্য পরিদর্শক হিসেবে আলোচিত চরিত্র। বহিরাগত লেখক হিসেবে আমেরিকার নিউইয়র্কের বেনেলিকার আন্দোলনেও গভীরভাবে জড়িত হয়েছিলেন। ইংরেজী ও আরবী ভাষার লেখালেখি করেছেন। আরব বিশ্বে জিবরান বিদ্রোহী সাহিত্যিক ও রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। ক্লাসিক্যাল ধারা ডিঙ্গিয়ে তিনি আধুনিক আরবী সাহিত্যে রোমান্টিক স্টাইলে রেনেসাঁর প্রবর্তন করেন বলে সমালোচকদের মত। এখনও লেবাননে তাঁকে সাহিত্যিক বীরপুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৩.
‘যাকে তুমি ভালবাস, তুমি তার একজন দাস । কারণ তুমি তাকে ভালবাস এবং একজন দাস ভালবাসে তোমাকে কারণ সে ভালবাসে তোমাকে।’- কাহলিল জিবরান
কাহলিল জিবরান ( জন্ম: ৬ জানুয়ারি, ১৮৮৩, লেবানন – মৃত্যু: ৪ এপ্রিল, ১৯৩১, যুক্তরাষ্ট্র) ইংরেজিভাষী বিশ্বে মূলত তাঁর রচিত বই দ্য প্রফেটের কারণে পরিচিত। স্বচ্ছ জলের অবাধ গতিময়তা আর স্বপ্নসম গীতিময়তার আখ্যানের আত্মীকরণে তিনি জন্ম দেন – জিব্রানিজম নামের নতুন রেখাময়তার অনুপম ছাপচিত্রের। জিবরান এর অমিত অর্ন্তদৃষ্টির, দিব্যতার রহস্যময়তা আর প্রজ্ঞা পারমিতার সংযোগ, তাই তাঁকে সাহিত্যবোদ্ধাদের কেউ কেউ অভিধা দিয়েছেন – লেবাননের আধুনিক নবী! আর এটাও অজানা নয় শেক্সপিয়র এবং লাও- সু এর পরেই সর্বাধিক পঠিত হয় জিবরানের পংক্তিমালা ! জিবরানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল- দ্য প্রফেট, ব্রোকেন উয়িংস, স্পিরিট রিবেলিয়াস, দ্য বিলাভড, দ্য গার্ডেন অব দ্য প্রফেট, টিয়ারস অ্যান্ড লাফটার ইত্যাদি।
৪.
‘নিশ্চিত আনন্দের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে বেদনার একটি অংশ এবং এটা বিস্ময়কর ।’ – কাহলিল জিবরান
জিবরানের জন্ম উত্তর লেবাননের বাশহরিক শহরে ১৮৮৩ সালের ৬ জানুয়ারি, স্বল্পবিত্ত এক মেরোনিক-ক্যাথলিক পরিবারে। চরম অভাব-অনটন আর দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি। অল্প বয়সে জিবরান তাঁর পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হন। সেখানে তিনি শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু করেন। তিনি ইংরেজি ও আরবি দুই ভাষাতেই লিখতেন। আরব বিশ্বে জিবরানকে সাহিত্য ও রাজনৈতিক বিদ্রোহী হিসেবে দেখা হয়। আধুনিক আরবি সাহিত্যের রেনেসাঁয় তাঁর রোমান্টিক ধারা ধ্রুপদী ধারা থেকে আলাদাভাবে জায়গা করে নিয়েছে, বিশেষত তাঁর গদ্য কবিতা। লেবাননে তিনি এখনও সাহিত্যের বীর হিসেবে সম্মানিত হন।
৫.
‘ভালবাসা প্রতিদিন ভালবাসা নবায়ন করে না, যা পরিণত হয়েছে অভ্যাসে এবং এর উল্টোদিকেই রয়েছে দাসত্ব।’- কাহলিল জিবরান
‘নুবতাহ ফি ফান আল মুসিকা’ আরবি ভাষায় তার প্রথম গ্রন্থ। প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৫ সালে। দ্য ম্যাডম্যান ইংরেজিতে প্রকাশিত তার প্রথম গ্রন্থ। এটি প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। এ ছাড়াও আরবি ও ইংরেজি ভাষায় জিবরান আরো প্রায় ১৪টির মতো কাব্য ও গল্পগ্রন্থ লিখেছিলেন। অনেকের কাছেই তিনি রহস্যময়। মানুষের অন্তর্গত প্রকৃতি আর মানসিকতাকে চিত্রকলা ও লেখার মাঝে ধারণ করতে চাইতেন বলেই কারো কারো কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন রহস্যময় এক শিল্পী। তার অন্তর্দৃষ্টির জন্য তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন। দার্শনিক প্রজ্ঞা আর আত্মোপলব্ধি দিয়ে তিনি সত্যিকারের জীবনবোধের সন্ধান করেছেন।
৬.
‘প্রত্যেক পুরুষই দুজন নারীকে ভালবাসে । একজন হল তার কল্পনার সৃষ্টি এবং অন্যজনের এখনো জন্ম হয়নি।’- কাহলিল জিবরান
কবিতা ছাড়াও তাঁর গভীর দখল ছিল গদ্যে। ছিলেন মিসটিক চিত্রকর, পাথর ভাঙ্গার কলাকৌশল শেখার জন্য প্যারিসেও গিয়েছিলেন; লিখেছেন আরব সঙ্গীতের ওপর ডিসকোর্স। শিল্প, সংস্কৃতি আর সাহিত্যের অনেক বিষয়ের ওপরই তার প্রবল আগ্রহ ছিল। তবে সংগীত ও চিত্রকলায় তার আগ্রহ বেশি ছিল। তার চিত্রকর্মগুলোও অনন্য। লেবাননে থাকাকালীন সময়ে চিত্রকলায় মনোযোগী হন জিবরান। সেখানকার প্রকৃতি আর মানুষই ছিল তার চিত্রকলার অনুপ্রেরণা। তবে “প্রফেট”-এর জন্যই বিশ্বময় জিবরানের খ্যাতি। আজও। পথ দেখিয়েছেন আধুনিক আরবি ভাষায় রোমানটিক কবিতা লেখার। সহজ সরল ভাষায় লিখেছেন জিবরান। ছিলেন খ্রিস্টান কাঠপাদরিদের বিরোধী। যে জন্য লেবানিজ গির্জের বিরাগভাজন হয়েছিলেন জীবদ্দশায়। জিবরান প্রথমে নিজেকে মনে করতেন একজন সিরিয়-আরব, তারপরে খ্রিস্টান মারোনাইট। আমূল আধুনিকায়ণ চেয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের- তবে তা অবশ্যই পশ্চিমের একপেষে অন্ধ অনুসরণ করে নয় । ব্যাক্তির মুক্তি, শ্রেণি শোষন এবং শাসনযন্ত্রের রুক্ষতার বিরুদ্ধে আমৃত্যু ছিলেন উচ্চকিত।
৭.
‘ব্যর্থতার ভিতর একজন কবি তার হৃদয়ের সঙ্গীতের জননীকে অনুসন্ধান করবে।’- কাহলিল জিবরান
কাহলিল জিবরান ১৯৩১ সালের ১০ এপ্রিল মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু রেখে যান অমর সৃষ্টিকর্ম।ফলে তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই আমাদের মাঝে আজো বেঁচে আছেন। আমরা তাঁকে ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
৮.
‘কবিতা হচ্ছে অভিধানের যতিচিহ্নসহ আনন্দ, বেদনা ও বিস্ময়ের ভাগাভাগি।’ – কাহলিল জিবরান
এবার কাহলিল জিবরান এর একটি পরিচিত ও বিখ্যাত কবিতা ‘সন্তানদের নিয়ে’ পাঠ করা যাক।
তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়।
জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্রকন্যা।
তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়।
এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও।
তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,
কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে।
তুমি তাদের শরীরকে বাসগৃহ জোগাতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে নয়।
কারণ তাদের আত্মা বাস করে ভবিষ্যতের ঘরে। যেখানে তুমি যেতে পারো না,
এমনকি তোমার স্বপ্নের মধ্যেও নয়।
তুমি তাদের মতো হওয়ার সাধনা করতে পারো, কিন্তু
তাদের তোমার মতো বানানোর চেষ্টা কোরো না।
কারণ জীবন পেছনের দিকে যায় না, গতকালের জন্যে বসেও থাকে না।
তোমরা হচ্ছ ধনুক, আর তোমাদের সন্তানেরা হচ্ছে ছুটে যাওয়া তির।
ধনুর্বিদ অনন্তের পথে চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন তার তির ছোটে
দ্রুত আর দূরে।
তুমি ধনুক, তুমি বাঁকো, ধনুর্বিদের হাতে তোমার বেঁকে যাওয়া যেন আনন্দের জন্য হয়।
তিনি কেবল চলে যাওয়া তিরটিকে ভালোবাসেন তা-ই নয়,
তিনি তো দৃঢ় ধনুকটিকেও ভালোবাসেন।
(কবিতার অনুবাদ: আনিসুল হক)
৯.
এবার জিবরানের অনুগল্প পাঠ করা যেতে পারে। সঙ্কলিত গল্পগুলো ইন্ডিয়ালগ পাবলিকেশন্স (প্রা.) লি. প্রকাশিত সিলেকটেড ওয়ার্কস অব কাহলিল জিবরান থেকে নেয়া হয়েছে। ভাষান্তর করেছেন জাফর আলম।
৯.২
প্রেমের গান-
একদা একজন কবি একটি অপূর্ব প্রেমের গান লিখেছিলেন। তিনি এই লেখা গানের অনেকগুলো কপি করে পরিচিত নারী-পুরুষ ও বন্ধুবান্ধবদের কাছে পাঠিয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে একজন যুবতীও ছিলেন। যুবতী এই মেয়েটির সঙ্গে তার একবারই দেখা হয়েছে। সে পাহাড় শ্রেণীর পেছনে পদক্ষেপ সমতলে বসবাস করত।
দু-একদিনের মধ্যে এক বার্তা বাহক মেয়েটির একটি চিঠি নিয়ে এসে হাজির। পত্রে মেয়েটি লিখেছে, আপনার প্রেমের গান পড়ে গভীরভাবে আমি আপ্লুত হয়েছি। আপনার গান আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এক্ষুনি এসে আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে আমাদের বাগদানের ব্যবস্থা করার জন্য আলাপ করুন।
কিন্তু কবি মেয়েটির চিঠির উত্তরে লিখলেন, ‘বন্ধু এটা ছিল একটি নিছক ভালবাসার গান, এই গান একজন কবির হৃদয় থেকে প্রকাশ পেয়েছে। প্রত্যেক নারীর জন্য প্রত্যেক পুরুষ এই ধরনের গান তো লিখেই থাকে।’ মেয়েটি আবার কবির পত্র প্রাপ্তির পর জবাবে লিখেছে, ‘আপনি এক কথায় শব্দের দ্বারা ভ-ামি করেছেন, আপনি একজন মিথ্যাবাদী। আজ থেকে আমার মৃতদেহ কফিনে না তোলা পর্যন্ত আমি আপনার মতো সকল কবিকে ঘৃণা করব।’
৯.৩
চার কবি-
একটি টেবিলের ওপর পিতলের বড় পাত্রে মদ রাখা ছিল। টেবিলের চারদিকে চারজন কবি বসেছিল।
প্রথম কবি বললেন, ‘আমি মনে করি, আমি আমার তৃতীয় নম্বরে শূন্যে ধুমায়িত মদের সুবাস পাচ্ছি, যেন পাহাড়ের জঙ্গলে শূন্যে উড়ন্ত পাখির দারুণ ভিড়।’
দ্বিতীয় কবি মাথা তুলে বললেন, ‘আমি কানের ভেতর এসব পাখির কিচিরমিচির আর গানের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সেই গানের গুঞ্জন আমার হৃদয়ে স্পর্শ করেছে যেন সাদা গোলাপের পাপড়ি মৌমাছিকে বন্দী করে রেখেছে।’
তৃতীয় কবি চোখ বন্ধ করে দু’হাত উপরের দিকে প্রসারিত করে বললেন, ‘আমি মৌমাছিকে যেন হাতে স্পর্শ করছি। আমি উপলব্ধি করি, তাদের পাখার বাতাস ঘুমন্ত পরীর শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো আমার আঙ্গুল ছুঁয়ে যাচ্ছে।’
চতুর্থ কবি উঠে দাঁড়ায়। মদের পাত্রটি হাতে তুলে নিয়ে বলল, ‘হায় বন্ধুগণ, আমার দুরদৃষ্টি আর শ্রবণ ও স্পর্শশক্তি অত্যন্ত দুর্বল। আমি এই মদের সুবাসনাকে পাই না অথবা মৌমাছির গান আর পাখার শব্দ শুনতে পাই না। আমি শুধু মদের বিষয়টি উপলব্ধি করি।’
অতএব, এখন আমার মদ পান করা উচিত। কারণ মদ আমার বোধশক্তিকে শাণিত করবে আর এর ফলে আমাকে স্বর্গীয় সুখের উচ্চমার্গে নিয়ে যাবে।’
একথা বলার পর পাত্রটি তার মুখের কাছে নিয়ে পাত্রের মদের শেষ বিন্দু পর্যন্ত পান করে পাত্রটি খালি করে ফেলল।
অপর তিন কবি হাঁ করে তার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কারণ তারাও মদের জন্য লালায়িত ছিল আর তাদের চোখে মুখে আবেগহীন ঘৃণা ফুটে ওঠে।
৯.৪
ন্যায় বিচার
এক রাতে রাজপ্রাসাদে এক ভোজসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে একজন লোক এসে হাজির, সে নিজেকে প্রটেস্ট্যান্ট বলে রাজকুমারের কাছে পরিচয় দেয়। উপস্থিত লোকজন দেখল লোকটির এক চোখ কানা; চোখের কোঠরে রক্তমাখা।
রাজকুমার লোকটিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার কি হয়েছে।’ লোকটি উত্তর দিল, ‘হে মহান যুবরাজ, আমি একজন পেশাদার চোর। সে রাতে আকাশে চাঁদের আলো ছিল না, অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত।
আমি একটি মুদ্রা বিনিময়কারীর দোকানে চুরি করতে গেছি। কিন্তু ভুলক্রমে আমি মুদ্রা বিনিয়োগকারীর দোকানের পরিবর্তে জানালা দিয়ে একটি তাঁতির কামরায় ঢুকে পড়ি। সেখানে আমার একটি চোখ তাঁতের কলে উৎপাটিত হয়। হে মহান যুবরাজ, আমি এই ঘটনার সুবিচার চাই। আপনি বিচার করুন।’
তৎক্ষণাত তাঁতিকে রাজসভায় ডাকা হলো। আর তাঁতির একটি চোখ উপড়ে ফেলার নির্দেশ জারি করা হলো।
তাঁতি বিনয়ের সঙ্গে আর্জি পেশ করল, হে মহান যুবরাজ আপনার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ ন্যায্য। আমারও একটি চোখ উপড়ে ফেলাই সঠিক। হায়, কাপড় বুনার সময় দু’দিকে চোখ রাখার জন্য আমার দুটি চোখই প্রয়োজন। কিন্তু আমার একজন প্রতিবেশী মুচি আছে, তারও দুটি চোখ আছে। কিন্তু তার পেশাগত কাজের জন্য দুটি চোখের প্রয়োজন নেই।’
যুবরাজ মুচিকে ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। মুচি দরবারে এসে হাজির। তার দুটি চোখের একটি উপড়ে ফেলা হলো, ফলে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হলো।
৯.৫
সমালোচক-
একদিন সন্ধ্যায় ঘোড়ার পিঠে চড়ে একজন পরিব্রাজক সমুদ্রের তীরের দিকে যাচ্ছিল। পথের ধারে সে একটি সরাইখানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। ঘোড়াটি সরাইখানার দরজার পাশে বেঁধে রেখে ভেতরে প্রবেশ করে।
মধ্যরাতে সকলে যখন ঘুমিয়ে তখন এক চোর এসে পরিব্রাজকের ঘোড়াটি চুরি করে নিয়ে যায়।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল, ঘোড়াটি তার চুরি হয়েছে। সে ঘোড়াটির জন্য ব্যথিত হলো এবং মনে দারুণ আঘাত পেল।
সরাইখানার অবস্থানকারী অন্যান্য মুসাফিররা জেগে উঠলে সকলে এসে তাকে ঘিরে বসল তারপর আলাপাচারিতা শুরু করে।
প্রথম ব্যক্তি বলল, তুমি কেমন বোকা, আস্তাবলের বাহিরে ঘোড়া রেখে গেলে।’
দ্বিতীয় জন বলল, ‘এমন অনেক বোকা লোকও আছে যে ঘোড়ার পা না বেঁধে রেখে ঘুমায়।’
তৃতীয় জন বলল, ‘ঘোড়ার পিঠে চড়ে সমুদ্রের তীরের দিকে ভ্রমণ করা বোকামি।’
চতুর্থ মুসফির বলল, ‘একমাত্র অলস এবং পায়ে চলা মন্থরগতির লোকের নিজস্ব ঘোড়া আছে।’
এদের আলাপচারিতায় ঘোড়া চুরি যাওয়ায় মুসাফির আশ্চর্য হলেন, তারপর চিৎকার দিয়ে উঠেন, ‘বন্ধুরা, আমার ঘোড়া চুরি হয়ে গেছে।
আপনারা সকলে আমাকে দোষারূপ করছেন আর ভুলত্রুটির সমালোচনা করছেন। কিন্তু আমি হতবাক, যে লোকটি আমার ঘোড়া চুরি করল তার সম্পর্কে একটি ও নিন্দাবাক্য উচ্চারণ করেননি।’

(তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া, দৈনিক জনকণ্ঠ, ইন্টারনেট)

আবদুল্লাহ আল মোহন
১০ এপ্রিল, ২০১৬ / ১০ এপ্রিল, ২০১৯

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর