Monday, মে ২০, ২০২৪
শিরোনাম

শান্তনু কায়সার : প্রয়াণদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

আবদুল্লাহ আল মোহন


১.
সৃজনশীল শিল্প সাধনায়, গবেষণায় নিরলস সাধক অধ্যাপক শান্তনু কায়সার। এমন একজন লেখক ছিলেন তিনি, সাহিত্য ও জ্ঞানের সব শাখায় তাঁর ছিলো নিরন্তর পথচলা। তাকে হারিয়েছি আমরা ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টায়, তিনি ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। উল্লেখ্য যে, তিনি বেশ কিছুদিন ধরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাহিত্য সাধক, প্রাবন্ধিক সমালোচক শান্তনু কায়সারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। শান্তনু কায়সারের প্রধান পরিচিতি প্রাবন্ধিক, গবেষক কিংবা সমালোচক হলেও সৃজনশীল সাহিত্য ধারার প্রায় সব ক’টি অংশেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। কথাশিল্পী জাকির তালুকদারের ভাষায়, ‘সাহিত্য তাঁর কাছে ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সহযোদ্ধা।’ আজ (১১.৪.২০২০) প্রিয় পিয়াসের (Pias Majid) ফেসবুকের শব্দাবলী আমাকে দারুণভবে আলোড়িত করলো। অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের কবরে ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর সচিত্র ছবি যুক্ত করে পিয়াস উচ্চারণ করেছে এক বুক হাহাকার, ‘সারাজীবন অক্ষর-সবুজের সাধনা করেছেন। আজ ঘুমিয়ে আছেন নিজ গ্রাম চাঁদপুরের সাচনমেঘের এমন মায়াসবুজে। গত বছর এক পড়ন্ত বিকেলে তাঁর কাছে আমরা; কথাশিল্পী মইনুল হাসান, কবি মুহাম্মদ ফরিদ হাসান আর আমি।
কবি-গবেষক- নাট্যজন- অনুবাদক -সংস্কৃতি-সংগঠক শান্তনু কায়সারের চলে যাওয়ার আজ তিন বছর।
যদিও জানি চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।
তুমি রবে নীরবে…’
২.
বাংলা একাডেমি পুরষ্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক শান্তনু কায়সার ১৯৫০ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন কুমিল্লা জেলা, বর্তমান চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার সাচানামেঘ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সুনিপুণ মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি সারাদেশে হয়েছেন বহুল জনপ্রিয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত বই:কবিতা: রাখালের আত্মচরিত, শুভ সুবর্ণ জয়ন্তী ছোটগল্প: ফুল বাসে, পাখি ডাকে, অর্ধ শতাব্দী, উপন্যাস: শকুন নাটক: তুমি, নাট্যত্রয়ী সম্পাদনা : খান মোহাম্মদ ফারাবী রচনাসমগ্র প্রবন্ধ : শওকত ওসমান, বঙ্কিমচন্দ্র, তৃতীয় মীর, বাংলা কথাসাহিত্য: ভিন্ন মাত্রা, স্বর্ণ ও শুভ,, নজরুল কেন নজরুল, তৃতীয় প্রজন্মের কাছে, অনুবাদ: বিদ্রোহী নাট্যতত্ত্ব: ত্রয়ী নাট্যকার ইত্যাদি। কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ-গবেষণা, অনুবাদ ও সম্পাদনা মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৪৫টি। আমৃত্যু সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ শান্তনু কায়সার পেয়েছিলেন অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননা। পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে: প্রত্যাশা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯০), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), অদ্বৈত মলস্নবর্মণ স্মৃতি পুরস্কার, ভারত (১৯৯৯), অদ্বৈত মলস্নবর্মণ পুরস্কার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া (২০১৩), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০১৪), জীবনানন্দ পুরস্কার (২০১৩), কুমিলস্নার কাগজ পুরস্কার (২০০৫)। সাহিত্যের অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মেধাবী গদ্যলেখক শান্তনু কায়সারের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
৩.
শান্তনু কায়সারের প্রয়াণের চরম দু:সংবাদটি জানার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শক্তিমান কথাশিল্পী জাকির তালুকদার মূল্যায়ন করে লিখেছেন, ‘শান্তনু কায়সারকেও অকালে হারালাম আমরা। এমন একজন লেখক তিনি, সাহিত্য ও জ্ঞানের সব শাখায় তাঁর ছিল নিরন্তর পথচলা। আমাদের সবচাইতে আপডেটেড লেখকদের একজন ছিলেন তিনি। তরুণতম কবি ও কথাসাহিত্যিকের লেখার খোঁজ রাখতেন। তাঁর ছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, দার্শনিক এবং নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য পোষণ করতেন না। সেই কারণে সরকারী ও বিরোধী দলের অন্ধ সমর্থক কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কাছে ছিলেন বিরক্তির পাত্র। তবে রচনার গুণ এবং মননশীলতার উঁচু মাপের কারণে তাঁর রচনাকে কেউ অস্বীকার করতে পারেনি। পারেনি অস্বীকার করতে তাঁকেও। অনেক লিখেছেন তিনি। আরো অনেক বেশি লেখা বাকি রয়ে গেল। কোনোদিন আর লেখা হবে না সেই লেখাগুলো। কারণ শান্তনু কায়সারের লেখা অন্য কেউ তো আর লিখতে পারবেন না।’ ‍আসলেই তাই। আর তেমনই এক নির্মোহী সাহিত্য সেবক ছিলেন তিনি। যেমনটি এক সাক্ষাৎকারে শান্তনু কায়সার বলেছিলেন, ‘আমি তখনই লিখি যখন আমার কাছে তা অপরিহার্য মনে হয়।’ তাঁর স্মৃতির স্মরণে সেই সাক্ষাৎকারটি পাঠ করা যাক।-
৩.২
‘চিরাচরিত প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। আপনার লেখালেখির শুরু সম্পর্কে আমাদের বলুন।
লেখালেখির শুরু অনেক আগে, যখন আমি স্কুলে পড়তাম। তখন পূর্বদেশ বলে একটা পত্রিকা ছিল। তোমরা তো সেই পত্রিকা দেখনি। পূর্বদেশ ঢাকা থেকে বের হতো। চট্টগ্রামের পূর্বদেশ নয়। ১৯৬৪ সালের দিকের ঘটনা। একটা কবিতা ছাপা হয়েছিল সেই পূর্বদেশ পত্রিকায়। অনেক আগের কথা। কবিতার বিষয় কী ছিল মনে নেই। তখনও আমি সিরিয়াসলি লেখালেখিটা নিইনি। পরে আমি যখন ১৯৬৬ সালের দিকে ঢাকা কলেজের ছাত্র, তখন লেখালেখি সিরিয়াসভাবে শুরু করি। তারপর থেকে নিয়মিত লিখছি। বিভিন্ন রকম লেখা লিখতাম। যখন যা মাথায় আসত তাই লিখতাম। মনে হলো গল্প লিখব, গল্প লেখা শুরু করলাম। মনে হলো এই বিষয়ে প্রবন্ধ লেখা দরকার প্রবন্ধ লিখলাম। নির্দিষ্ট করে কোন বিষয়কে সামনে নিইনি।
আপনি তো প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, নাটক ইত্যাদি লেখেন। কোন শাখায় লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি?
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা বিষয় নয়। আমি তখনই লিখি যখন আমার কাছে তা অপরিহার্য মনে হয়। আমার এ লেখাটি লিখতে হবে, না লিখে উপায় নেই; তখনই লিখতে বসি। সেটা গল্প হোক, প্রবন্ধ হোক বা কবিতাই হোক।
এখন কি আগের মতো কবিতা লেখেন?
জীবনের প্রথম লেখাটা তো কবিতাই লিখেছিলাম। আগের মতো ওই অর্থে আর কবিতা লেখা হয় না। তবে কবিতার প্রতি আমার অন্যরকম একটি টান এখনও আছে। এবার যখন ব্যাঙ্গালুরে গেলাম তখন মুহম্মদ নূরুল হুদা, নির্মলেন্দু গুণ, সৈয়দ শামসুল হক আমাদের টিমে ছিলেন। তখন ওঁরা আমাকে কবি হিসেবে ব্যাঙ্গালুরে পরিচয় করে দিয়েছিল। সেখানে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও ছিল।
আমার প্রথম কবিতার বই ‘রাখালের আত্মচরিত’ ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে দুই দশক গ্যাপ দিয়ে দ্বিতীয় কবিতার বই বের করেছি। এখন কবিতা ঐভাবে লেখা হয় না। সেটা হয়ত ব্যস্ততার জন্য। কবিতার জন্য যে অবকাশ প্রয়োজন তেমন অবকাশ পাচ্ছি না। যখন বিভিন্ন দিক থেকে অবসর পাব তখন হয়ত আবার কবিতার দিকে পা বাড়াব। কবিতা লিখে আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। আমার ‘অন্তিম যাত্রার প্রস্তাব’ বলে একটি কবিতা আছে। এই কবিতাটি এখনও আমাকে আনন্দ দেয়।
৩.৩
আপনার প্রবন্ধের মধ্যে একটা অন্যরকম স্বাদ খুঁজে পাওয়া যায়…
সেটা হয়ত আমার লেখার ধরনের কারণে। সাহিত্যের নানা বিষয় আশয়ে আমার বসবাস। আমি যখন লিখি ফর্মটা আমার প্রয়োজনের জন্য আমি সৃষ্টি করি। সেই ফর্মে লিখতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। একটা উদাহরণ দেই। আমার ‘তৃতীয় মীর’ বইটার কথা বলি। এটা একটা প্রবন্ধের বই। কিন্তু এটা যখন তুমি পড়বে, তখন তোমার কাছে এটা প্রবন্ধের বই বলে মনে হবে না। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের যে আনন্দ, যে স্বাদ, যে চিন্তা সেটা কিন্তু তুমি ‘তৃতীয় মীর’-এর মধ্যে পাবে। এটা আমার জন্য একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। এই কাজটা আমার খুব প্রিয়। পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের কাছেও বইটি সমাদৃত। আমি সেখানে ‘তৃতীয় মীর’-এর লেখক হিসেবে পরিচিত। অনেকেই এই বইটিকে কেবল প্রবন্ধের বই বলেন না। এই ফর্মে লিখতে আমার প্রচুর সময় লেগেছে। কিন্তু আমি অনেক আনন্দ পেয়েছি। তৃপ্তি পেয়েছি। এ জন্য আলাওল পুরস্কারও পেয়েছিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে ‘প্রথম আলো’ লিখলেন, সেখানেও তাঁকে এই বইটি সাহায্য করেছে।
আপনি অনেক জায়গায় অনেকবার বলেছেন : সাহিত্য চর্চায় সিরিয়াস হতে হবে…
তোমাকে এ প্রসঙ্গে আগে ঋত্বিক ঘটকের কথাটা বলি। ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, পুতু পুতু প্রেম অর্থহীন। সাহিত্য কোন ঢংয়ের বিষয় নয়। সাহিত্য সিরিয়াস বিষয়। দশ লাইনও যদি লেখ তাহলে তা সিরিয়াসভাবেই লিখতে হবে। যা বিশ্বাস করো তার প্রতি তুমি বিশ্বস্ত থাকবে। বাকি কিছু তোমার মনে রাখার প্রয়োজন নেই। তাহলে দেখবে সাহিত্য তোমাকে তোমার পথে নিয়ে যাবে। আমি অন্তত এটা মনে করি। আমাকেও অনেক বৈরিতা অতিক্রম করতে হয়েছে। আমি এসব বিষয়-আশয় পার হয়েই এখন পর্যন্ত লিখছি।
৩.৪
আপনার প্রিয় লেখক কারা?
আমার প্রিয় লেখক অনেকেই আছেন। শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত আলীকে পড়ি। ভাল লাগার কি শেষ আছে। প্রিয় লেখকদের তালিকা বলে তো শেষ করা যাবে না। আবার আমি তরুণদের লেখাও আগ্রহভরে পড়ি। একটা সময় প্রচুর পড়তাম। এখন চোখের সমস্যা তো আছেই। তাই বাধ্য হয়েই পছন্দের বইগুলোই পড়তে হচ্ছে। তারপরও আমি তরুণদের লেখা পড়ি। কারণ এর মধ্য দিয়ে আমি বর্তমানের তরুণরা কী ভাবছে, কী পরিবর্তন হচ্ছে সাহিত্যের- তা জানতে পারি।
সমকালীন সাহিত্য চর্চা সম্পর্কে কী বলবেন?
সমকালে যারা সাহিত্য চর্চা করছে তাদের একটা নেতিবাচক দিক আছে। সেটা হচ্ছে এখনকার তরুণরা অনেকেই এখনকার লেখাই কেবল পড়ছেন। কিন্তু আগের লেখকদের লেখা তারা পড়ছেন না। ক্লাসিক সাহিত্য সম্পর্কে ঐ অর্থে তাদের ধারণা স্বচ্ছ নয়। অনেকেই হয়ত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বা শহীদ কাদরী বা শামসুর রাহমানই পড়ছে না। এটা একটা ক্ষতিকর ব্যাপার। কেননা, সাহিত্যের ধারাক্রম জানাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি যদি নতুন কিছু করতে চাই তবে পুরাতন বা অতীতকে জানতে হবে। অতীতকে না জেনে তো নতুন কিছু করা সম্ভব নয়। আগে জানতে হবে সাহিত্যে এমন এমন কাজ কী বা কোথায় হয়েছে। তারপর এর বাইরে গিয়ে লেখার চেষ্টা করতে হবে। তবে তরুণদের চেষ্টা ও উদ্দীপনা আমার কাছে ভাল লাগে।
৩.৫
লেখকের সামাজিক দায় প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
লেখক যিনি হবেন তাকে সৎ হতে হবে। লেখকের সামাজিক দায় অবশ্যই আছে। তবে সেটা ঐরকম অর্থে নয়। বলে কয়ে তো সাহিত্যে দায়িত্ব পালন হয় না। লেখক যদি সৃষ্টিশীল হয়, সৃজনশীল হয়, তিনি যদি জীবন থেকে উপকরণ নেন, মৃত্তিকাঘনিষ্ট হন তবে তার লেখায় সামাজিক বিষয় আশয় উঠে আসবেই। ক্ষুদ্রার্থে নয়Ñ সূক্ষ্ম অর্থে, শৈল্পিক অর্থে, বৃহৎর অর্থে লেখকের সামাজিক দায় আছে।
আপনার শৈশব জীবন তো চাঁদপুরেই কেটেছে…
হ্যাঁ। আমার শৈশব কেটেছে চাঁদপুরেই। আমাদের বড়স্টেশনের কাছে বাসা ছিল। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত কিন্তু আমি চাঁদপুরে ছিলাম। এখানে আমি বেড়ে উঠেছি।
৩.৬
সবশেষে পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।
জীবনের বিচিত্র সময়ে বিচিত্র রকম লেখা আমি লিখেছি। সেই যে ’৬৬/৬৭-র দিকে লেখালেখি শুরু করলাম, সেটা এখনও অব্যাহত আছে। যতদিন বাঁচি লেখালেখি অব্যাহত রাখতে চাই। পাঠকরা আমার সঙ্গে ছিলেন। অনেক পাঠক উৎসাহ দিয়েছেন। ভাল-মন্দ জানিয়েছেন। তাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আর হ্যাঁ, ভাল পাঠক হওয়াও একটা বড় বিষয়, একটি ভাল অর্জন।
৪.
শান্তনু কায়সারের প্রয়াণের সংবাদটি আমাদের প্রচার মাধ্যমে যথাযথভাবে প্রকাশিত না হওয়ায় আমার মতোন অনেকেই সংক্ষুব্ধ, বেদনাহত। যে সমাজ একনিষ্ঠ সাধক-কর্মিদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে কৃপণতা দেখায়, সে সমাজে-রাষ্ট্রে সুস্থচিন্তা বিকশিত হতে পারে না, গুণি ও জ্ঞানীজনের সৃষ্টি হয় না। প্রাবন্ধিক, সমালোচক, গবেষক ও কবি অধ্যাপক মোরশেদ শফিউল হাসান ক্ষুব্ধ হয়ে সমালোচনা লিখেছেন সত্য কথাটিই , ‘খাম ও বোতল দিয়ে কেনা যায়, শান্তনু কায়সার খুব সম্ভবত সেই গোত্রের লেখক বা বুদ্ধিজীবী ছিলেন না। তাই কি তাঁর অসুস্থতা ও চলে যাওয়ার খবর আমাদের মিডিয়ায় গুরুত্ব পেল না ?’ আরেক নন্দিত কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরের শোকাহত কলমও শব্দ ক্ষোভে, বেদনার সুরে বাজে এভাবে, ‘শান্তনু কায়সার ঋদ্ধ ও ঋজু ছিলেন । অধিকাংশ মানুষ ও মিডিয়া এ ধরনের কাউকে পছন্দ করে না।’
৫.
ব্যবসা, সবই আসলে বানিজ্য। সারাজীবন সততার সাথে শিক্ষকতায়, সৃজনী জ্ঞান সাধনায় নিমগ্ন থাকা গুণীজনের প্রয়াণ নিয়ে এক কলাম সংবাদও দেখি অনেক প্রচারপত্রে অথচ গোপন বিয়ে, বাচ্চার লুকোচুরি-মিথ্যাচারের সংবাদ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হতে হয়, প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। ধিকের অধিক ধিক সংশ্লিষ্ট ‘জ্ঞানপাপী’ সন্দেশ বিক্রেতাদের! শান্তনু কায়সারের স্মৃতির প্রতি আবারো জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। শান্তনু কায়সার আমাদের স্বজন- তাঁর চিন্তা,কর্ম দ্বারা তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন- থাকবেন। কারণ শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং সাহিত্যসাধনা ছিল শান্তনু কায়সারের সারাজীবনের ব্রত। তাঁর লেখা বাক্যে ও ভাষ্যে, বিবেচনায়, তিনি অমর হয়ে থাকবেন নিশ্চয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শান্তনু কায়সারের মতো মেধাবী গদ্যলেখক আর চোখে পড়ে না। আমাদের ম্রিয়মাণ সমালোচনা সাহিত্য এবং যুক্তি ও বিশেস্নষণহীন প্রবন্ধ-সাহিত্যে শান্তনু কায়সার ছিলেন সুস্পষ্ট ব্যতিক্রমী লেখক। তিনি সাহিত্যকে প্রথাগত দৃষ্টিতে দেখেননি, বিচার-বিশেস্নষণ করেছেন ননঅ্যাকাডেমিক জায়গা থেকে, নিজস্ব পাঠ-অভিজ্ঞতা ও শিল্পবোধ দিয়ে। তাঁর অবলোকন ও আবিষ্কার ছিল ভিন্নমাত্রার।
৬.
বিপরীত স্রোতের লেখক শান্তনু কায়সার ছিলেন একজন মৌলিক প্রাবন্ধিক ও গবেষক। বক্তব্য-বিষয়ের পাশাপাশি ভাষার লাবণ্যে তার গদ্যচর্চা এক নতুন ধারার উন্মোচক। ছিলেন অঙ্গীকারের মানুষ। নিজেদের পেশাগত বৃত্ত ছাপিয়ে সাহিত্যকে তারা আজীবন চর্চার বিষয় নির্বাচন করেছেন। সাহিত্যচর্চার সমান্তরালে জনমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তারা তাদের সৃষ্টিকর্মে নানামাত্রায় ভাস্বর করেছেন। কোন একজন লিখেছিলেন যেন আমাদেরই মনের কথাটি এভাবে, যে যুগে কাজের চেয়ে কোলাহল আমাদের বেশি আঁকড়ে ধরছে, যে সময় ভাব ও চিন্তাকে বাদ রেখে আমাদের যন্ত্রদানবের গতিতে ছুটে নিয়ে যাচ্ছে, যে সমাজ সৃজন-বীক্ষণের চেয়ে অর্থ ও বস্তুকে অধিক মূল্য দিচ্ছে; সে যুগ, সময় ও সমাজের মধ্যেই আমরা শান্তনু কায়সারকে পেয়েছি। এ থেকে বুঝতে পাই যে, ব্যক্তির লক্ষ্য ও আত্মবিশ্বাস যদি স্থির ও সংহত হয় তবে কোন প্রভাবই পথচলায় বিচ্যুতি ঘটাতে পারে না। আমরা শান্তনু কায়সারকে হারিয়েছি। তার দেহ লোকান্তরে গেছে, কিন্তু মননের অনুপম শিখা সমান যে দীপ তিনি রচনা ও কথকতার মধ্যে জ্বালিয়েছেন; শিল্প ও সৃজনের আয়োজনে প্রয়োজনে তা আমাদের উপযুক্ত আলো দেবে এবং সে আলোক প্রাঙ্গণে শান্তনু কায়সারের নাম উচ্চারণ হবে; তবে এ কথা হবে না : তিনি তো আর নেই।
৭.
লেখক আহমেদ মাওলা’র ভাষায় ‘শান্তনু কায়সার। এই নামেই তাঁর খ্যাতি, পরিচিতি এবং সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা ঘটে। যদিও তাঁর প্রকৃত নাম ছিল মো. আবদুর রাজ্জাক। প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন ছাড়া প্রকৃত নাম তিনি ব্যবহার করতেন না। স্বভাবে লাজুক, কিছুটা নেপথ্যচারী এবং স্পষ্টভাষী ছিলেন শান্তনু কায়সার। আড্ডায়, আলোচনায় তাঁকে কখনো মুখর কিংবা সরব হতে দেখা যায়নি। তবে মঞ্চে বক্তৃতাকালে তাঁর ব্যতিক্রমী ভিন্ন দৃষ্টিকোণ, গভীর বিশেস্নষণ, শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ এবং বিমোহিত করত। প্রচলিত সমাজের সঙ্গে খাপ না খাওয়া ও ঋজু স্বভাবের এক অনন্যসাধারণ চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন শান্তনু কায়সার। না, কারো সঙ্গে মেলানো যায় না তাঁকে। লোভ ও লাভের পথে হাঁটেননি তিনি। সামাজিক অসংগতি, অবক্ষয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের আস্ফালন – এসবের নিন্দা এবং কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। বলা যায়, তিনি প্রথাগত সমাজের উলটো স্রোতের যাত্রী ছিলেন।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘মননশীল গদ্য রচনা ও গবেষণা ছিল শান্তনু কায়সারের প্রধান ক্ষেত্র। তাঁর মেধা ও প্রতিভার অসাধারণ বিকাশ লক্ষ করা যায় সাহিত্য-সমালোচনা এবং গবেষণায়। সমকালীন সাহিত্যে শান্তনু কায়সারের মতো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন সাহিত্য-সমালোচক বিরল ছিল। বাংলা উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে তিনি লিখেছেন আলোকদীপ্ত গ্রন্থ। এ-গ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে একজন লিখেছেন, ‘শান্তনু কায়সার তীক্ষ্ম শিল্পবোধ প্রয়োগের মাধ্যমে বঙ্কিম-সাহিত্য বিশেস্নষণ করেছেন।’ (‘রশীদ আল ফারুকী’, ১৯৮৪, পৃ ৩১)
৮.
‘শান্তনু কায়সার : তাঁর স্মৃতি ও সৃষ্টি’ স্মৃতিচারণমূলক রচনায় স্বজন পিয়াস মজিদ লিখছেন, ‘গুরুভার বিষয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ-গবেষণার পাশাপাশি মাঝে মধ্যে হালকা চালের বিচিত্র বিষয়েও তাঁর কলম সচল থাকতো। শিক্ষাব্যবস্থায় জিপিএ-৫ পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে তিনি এ বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর অতিশ্রদ্ধেয় ও প্রিয় শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরে গেলে তিনি সে বিষয়কে উপজীব্য করেও গদ্য লিখেছেন। শান্তনু কায়সার সাহিত্য সমালোচনায় ছিলেন নির্মোহ ও নির্মম। যে নৈর্ব্যক্তিক নিরাসক্তিতে তিনি তাঁর পরিচিত প্রিয়জনেরও সাহিত্য বিশ্লেষণ করতেন তা অনেক সময় তাঁকে সমকালীন সমাজে অপ্রিয় করেছে কিন্তু এতে মোটেও বিচলিত হতেন না তিনি। আপাতদৃষ্টিতে কারো কারো কাছে তিনি হয়তো গাম্ভীর্যের প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছেন কিন্তু যারা তাঁর সঙ্গে মিশেছেন তাঁদেরই অনুধাবনে এসেছে একরাশ খোলা হাওয়ার মানুষ ছিলেন শান্তনু কায়সার। নিজের লেখাতেও প্রায়শই গভীরতার সঙ্গে মিলেমিশে যেতো রসবোধ। কলকাতায় কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউটে মহানায়ক উত্তমকুমার কথাশিল্পী শওকত ওসমানের ছাত্র ছিলেন এককালে আর পরবর্তীকালে ঢাকা কলেজে তাঁর ছাত্র ছিলেন শান্তনু কায়সার। শিক্ষক শওকত ওসমানকে নিয়ে লিখতে গিয়ে শান্তনু কায়সার ফিরে ফিরে বলেছেন ‘শওকত ওসমান বলতেন আমার ছাত্র উত্তমকুমার হইতে শান্তনু কায়সার।’ বন্ধুবৎসল ছিলেন দারুন। কথায় কথায় বলতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মুুহম্মদ নূরুল হুদা কিংবা কাজী মোস্তায়ীন বিল্লাহর কথা। শান্তনু কায়সার লেখার বিষয়ে ছিলেন ভীষণ নিয়মানুবর্তী ও পরিশ্রমী। বাংলা একাডেমি তাঁকে কুমিল্লা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব দিলে তিনি তাঁর কন্যা শাহানা নার্গিস আলোকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছেন গ্রাম-গ্রামান্তরে। বড় পত্রিকা থেকে অতিতরুণদের ছোটকাগজে লেখা দিতে একবার যদি তিনি সম্মত হতেন তাহলে ঠিক সময়ে নিজ দায়িত্বে লেখাটি পৌঁছে দিতেন। কোনো সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখা বা প্রবন্ধ উপস্থাপনের কথা থাকলে ঠিক সময়মতো সেখানে এসে উপস্থিত হতেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে কুমিল্লায় সমতট নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম হাতে নেন তিনি।’
৯.
ব্যথাতুর পিয়াস মজিদ আবেগতাড়িত হয়ে বলছেন অমূল্য শেষ কথাটি, ‘নিজের বইপত্রে লেখক-পরিচিতিতে লিখতেন ‘পর্বতমালা ও সমুদ্র দেখার আগে তিনি একটি ঘাসের ওপর একটি শিশিরবিন্দু দেখে নিতে চান। মাটির প্রদীপের বিনয় ও স্পর্ধা তাঁর জীবনের অন্বিষ্ট।’ সাতষট্টি বছরের জীবনের যুগপৎ বিনয়ী ও স্পর্ধিত যাপনে শান্তনু কায়সার আমাদের স্মরণযোগ্য হয়ে রইবেন নিঃসন্দেহে।’

(সূত্র : দৈনিক জনকণ্ঠ, ৪ মার্চ ২০১৬, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা)

আবদুল্লাহ আল মোহন
১২ এপ্রিল, ২০১৭ / ১২ এপ্রিল, ২০১৯/ ১২ এপ্রিল, ২০২০

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর