Sunday, মে ১৯, ২০২৪
শিরোনাম

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ : জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

আবদুল্লাহ আল মোহন


‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি।’- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
১.
আমাদের আত্মপরিচিতি আবিষ্কারের এবং স্বাজাত্যবোধ স্বদেশিকতার উদ্বোধনে একটি অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও ভাষাতত্ত্ববিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের চবিবশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বিশিষ্ট গবেষক, বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। উল্লেখ্য যে, তিনি ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উদ্দীপিত করেছেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যচেতনা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর রচনা এবং অধ্যাপনার মাধ্যমে আমরা চিনতে ও ভালোবাসতে শিখেছি আমাদের মাতৃভাষাকে, মাতৃভাষায় রচিত সাহিত্যকে। বিশ্বাসে, ধর্মসংস্কারে বৈচিত্র্য নিয়ে যে বাংলাদেশ, সে বাংলাদেশের আবিষ্কার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মাধ্যমে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অন্বেষণ আমাদের তাই বড় প্রয়োজন। কারণ, সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি এক জন প্রকৃত বাঙালি।
২.
বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, ধ্বনিতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একজন কীর্তিমান মহান পুরুষ। মাতৃভাষার প্রতি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা। ব্যক্তিগত জীবনে নিরহঙ্কার ও সাদামাটা এই মানুষটি বাংলাদেশের অহঙ্কার। তিনি তাঁর গোটা জীবনব্যাপী বাংলাভাষা, ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করে একে একটি মজবুত ভীতের ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হন। তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রথম যুক্তিপূর্ণ লেখনী উপহার দেন এবং এ মহান ভাষার বিরোধিতাকারীদের স্বরূপ উন্মোচন করেন। ‘মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি সব মানুষের পরম প্রিয় ও শ্রদ্ধার বস্তু’ এ অমর বাণীর যিনি উদ্গাতা তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও পণ্ডিত জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে যে গভীরতর নিষ্ঠায় গবেষণা পরিচালনা করেন তার কোনও তুলনা সমকালে খুঁজে পাওয়া ভার। অধ্যাপনা, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা, গ্রন্থাদি রচনার মাধ্যমেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর আপন পথে আপন ব্রত উদ্যাপন করে গেছেন। অসাধারণ পান্ডিত্য তাঁর ব্যক্তিত্বে যোগ করেছে মানবিক দ্যুতি। এজন্যই ভাষাতত্ত্বের পরিসর ছাপিয়ে সমাজরাষ্ট্রের নানা সংকটে তাঁকে আমরা সোচ্চার হতে দেখি। গভীরভাবে ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন কিন্তু ধর্মীয় আচারসর্বস্বতায় বিশ্বাসী ছিলেন না মোটেও। আমাদের জাতিসত্তার পরিচয়-নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তিনি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দিয়েছেন তা তার অখন্ড মানবধর্মবোধেরই সাক্ষ্য বহন করে। মুক্তির দিশারী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে অধ্যাপক মাহমুদ শাহ্ কোরেশী যথার্থই বলেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সমগ্র বিশ্বপ্রোপটে এক অনন্য মনীষার নাম। গবেষণা তার কাছে মোটেও উপরিতলের বিষয় ছিল না বরং তিনি খুঁজে পেতেন প্রাণের আনন্দ। এ কারণেই বহু ভাষার দতাকে তিনি কারিগরি বিষয় হিসেবে না দেখে ভাষাকে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপ্ত পাঠের পরিপূরক করে তুলেছেন। জ্ঞানসাধক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে নিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলছেন, শুধু বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও উদ্ভবকাল বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্বতন্ত্র উদ্ভাবন ছিল না, একই সঙ্গে সিংহলি ভাষার উৎপত্তিবিষয়ক তার মতামতও প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হয়। ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তার দূরবিস্তৃত গবেষণাচিন্তা বঙ্গীয় গবেষণাধারাকে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আবার, ধর্ম বিষয়ে পুরুষানুক্রমিক উত্তরাধিকার ও সংস্কার স্বীকার করে নিয়েও এক মুক্ত, উদার মনের অধিকারী ছিলেন ডক্টর শহীদুল্লাহ। আপন ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কারকে অনুধাবন করবার প্রয়াস পেয়েছেন যুক্তির আলোকে। সে কারণে সকল রক্ষণশীলতার উর্ধ্বে বিশ্বমানবিকতার আলোকে ভাস্বর ছিল তাঁর ধর্মজীবন।
৩.
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ আমাদের জ্ঞানরাজ্যে এক অনন্য কিংবদন্তি মহাপুরুষ। তিনি বলতেন: আমার ইচ্ছে হয় আমি নিজেকে স্বামী জ্ঞানানন্দ উপাধিতে ভূষিত করি। জ্ঞান চর্চাতেই ছিল তার আনন্দ। তিনি নানা খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। তাকে বলা হয় চলিষ্ণু বিদ্যাকল্পদ্রুম অর্থাৎ চলন্ত বিশ্বকোষ। পৃথিবীর তাবত জ্ঞানরাজ্যে তিনি অবাধে বিচরণ করেছেন, ২৪টি ভাষা তিনি আয়ত্ত করেছেন, ১৮টি ভাষার ওপর তার অসাধারণ পান্ডিত্য ছিল। এমন জ্ঞানীপুরুষ, এমন বহুভাষাবিদ পন্ডিতজন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। পৃথিবীর নানা ভাষা নিয়ে তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। ভাষা বিজ্ঞানের দুরূহ অঙ্গনে যেখানে অন্য পন্ডিততজনেরা বিচরণ করতে সাহস পাননি কিংবা বিচরণ করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, সেখানে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ নির্দ্বিধায় বিচরণ করেছেন এবং ভাষায় যে কত রহস্য রয়েছে, কত যে শব্দের ব্যঞ্জনা রয়েছে তা নির্ণয় করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, একজন ঝানু শিকারির মতো এই জ্ঞান শিকারি ভাষা ও শব্দের এবং বিভিন্ন ভাষার উচ্চারণ ও ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য উদ্ধার করে তার সমস্যা খুঁজে বের করেছেন, সেই সঙ্গে শব্দের মারপ্যাঁচ নিরূপণ করে তার সমাধান করেছেন। ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে তিনি এক অপরূপ নতুন মাত্রা সংযোজন করে বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে এক সুরম্য সড়ক নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন ভাষার শব্দ মূল নির্ণয়ে, এক ভাষার শব্দের সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দের মিল খুঁজে বের করতে তার মতো পারঙ্গম মনীষী আর দৃষ্ট হয় না। বাংলা, ইংরেজী, আরবী, উর্দু, ফারসী, ফরাসী, জাপানী, চাইনিজ, তামিল, তেলেগু, মারাঠী, জার্মান, কানাড়ী, মালায়ালম, হিন্দী, বেদনাগড়ী, প্রাকৃত, সংস্কৃত তুর্কী, অহমীয়া, উড়িয়া, লাটিন প্রভৃতি কত ভাষাই না তিনি জানতেন। বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর ওপরও তার ছিল সমান দক্ষতা।
৪.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহ পেয়েছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌। শান্তিনিকেতনে একাধিক বার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎও হয়েছিল। বিশ্বকবি নিজের ছবি ও বই উপহার দিয়েছিলেন তাঁকে। বিশ্বভারতী যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার ম্যানেজিং কমিটিতে রবীন্দ্রনাথ তরুণ গবেষক শহীদুল্লাহ্‌কে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। যদিও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে রবীন্দ্রনাথের এই অনুরোধ তিনি গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট ছিল। বাংলা বানান সংস্কার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ শহীদুল্লাহ্‌কে চিন্তা-ভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করেন। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধেই তিনি বাংলা বানান সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে তাঁর সুচিন্তিত মত প্রকাশে উদ্যোগী হন। শহীদুল্লাহ্‌ মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র কবি, সাহিত্যিক বা দার্শনিক নন। তিনি আমাদের দেশের এক জন প্রথম শ্রেণির ভাষাবিদও বটে।
৫.
দীর্ঘ কর্মময় জীবন কেটেছে ভারতীয় উপমহাদেশের ভাঙাগড়ার কালের মধ্যে। তাঁর জন্মের বছরেই যাত্রা শুরু করেছিল ভারতের জাতীয় আন্দোলনের প্রধান সংগঠন কংগ্রেস। এর অল্প দিন আগে গঠিত হয়েছিল জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল। তাঁর স্কুলজীবনের শেষদিকে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জনের বছরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন অসহযোগ-খেলাফত আন্দোলনের কালে। তাঁর জ্ঞানচর্চার প্রধান পর্বটিতে ঘটেছে ভয়াবহ দাঙ্গা ও ভারত বিভাগ। বিভাগোত্তর কালে তিনি যখন পূর্ব বাংলার চিন্তাবিদদের মধ্যে প্রধান, তখন এ ভূখণ্ডের মানুষ ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার অর্জনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এসবের মধ্যে এবং এসবকে সঙ্গী করেই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হয়ে উঠেছিলেন জ্ঞানতাপস।
৬.
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র (জন্ম: ১০ জুলাই, ১৮৮৫ – প্রয়াণ: ১৩ জুলাই, ১৯৬৯) পিতা মফিজউদ্দীন আহমদ ছিলেন পীর গোরাচাঁদের দরগাহর খাদেম। পৈতৃক পেশা থেকে বেরিয়ে ব্যতিক্রমী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ভাষা ও জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন। তিনি ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে উর্দু, ফারসি ও আরবি শেখেন এবং স্কুলে সংস্কৃত পড়েন। জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর বাবা মফিজুদ্দীন ছিলেন একজন ভাষাবিদ। তিনি চার-পাঁচটা ভাষা জানতেন। সাত ভাইবোনের মধ্যে ৬ষ্ঠ সন্তান ছিলেন তিনি। জন্মের পর আকিকা দিয়ে নাম রাখা হলো ইব্রাহিম। কিন্তু মা হুরুন্নেসা খাতুনের এটি পছন্দ হলো না। মা ডাকতেন শহীদুল্লাহ বলে। খুব হাসিখুশি চেহারার বলে পাড়ার অনেকেই জ্ঞানতাপসকে সদানন্দ বলে আহ্বান করতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন জ্ঞানানন্দ স্বামী বলে। এর অর্থ যে জ্ঞান লাভ করে আনন্দ পায়। ছোট থেকেই একটু দুষ্টু ধরনের ছিলেন শহীদুল্লাহ। প্রায় দিন বাবার কাছে নালিশ নিয়ে আসতো পাড়ার ছেলেরা। বড় সংসারে সাত ভাইবোন মিলে সারাদিন হৈ চৈ করে কাটতো। ছোটতে স্কুলে যাওয়া হয়নি তার। ছেলে বড় হচ্ছে এবং তার মধ্যে প্রতিভার লক্ষণ পাওয়া যাচ্ছে। বাবা চিন্তা করলেন দ্রুত শহীদুল্লাহকে স্কুলে ভর্তি করা দরকার। তাই দশ বছর বয়সে পড়তে যান হাওড়ার ইংরেজী স্কুলে। সেখান থেকে পাস করে হাওড়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন ১৮৯৯ সালে। কে জানতো এ দুষ্টুর মধ্যে অনেক প্রতিভা লুকায়িত আছে। এই দুষ্ট ছেলেটি এক সময় ভাল ফলাফল করে সবাইকে চমকে দিলেন। সপ্তম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য অর্জন করেন রুপার পদক। বাবার সব চিন্তা দূর হলো শহীদুল্লাহ্ ভাল ফলাফল করেছে বলে। ছোট থেকেই ভাষার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। তিনি নিজেই আঠারোটি ভাষা জানতেন এবং মনে করতেন নতুন একটি ভাষা শেখা অর্থ একটি দেশ জয় করা। তাই ছেলেরা যখন খেলাধূলায় ব্যস্ত তখন এই জ্ঞানতাপস ভাষাবিজ্ঞানী নিজে নিজেই বাড়িতে ভাষা চর্চা করতেন। লাটিম ঘোড়ানো, ঘুড়ি ওড়ানোর চেয়ে তিনি ভাষা চর্চায় বেশি আনন্দ পেতেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ “গ্রামের পাঠশালায় পড়াশোনা আরম্ভ করেছিলাম” বলেছেন তিনি ‘আমার সাহিত্যিক জীবন’ শীর্ষক প্রবন্ধে। লিখছেন, “এই পাঠশালায় ঈশ্বরচন্দ্রের প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, কথামালা ও রবাধোদয় পড়েছিলাম বলে মনে আছে। বোধহয় দশ বছর বয়সের সময় পিতার কর্মস্থান হাওড়ায় আসি। সেখানে একটা মাইনর স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম।” নিত্যনুতন ভাষা শেখা তাঁর বাতিকের মতো ছিল। তিনি নিজেই লিখেছেন : “আমি ঘরে বসে ফারসী, উদ্র্দু, হিন্দি ও উড়িয়া ভাষা কিছু শিখেছিলাম। গ্রীক ও তামিল অক্ষরও পড়তে শিখেছিলাম। সাধারণ ছেলেদের মতো ঘুড়ি ওড়ানো, নাটিম ঘোড়ানো, মারবেল খেলা প্রভৃতি খেলাধুলা না করে আমি ভাষা শিক্ষা করতাম।’
৭.
সারা জীবন লেখাপড়া, গবেষণা, অধ্যাপনা করে গিয়েছেন শহীদুল্লাহ্‌। এগুলিই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি ছিল অকুণ্ঠ ভালবাসা ও স্নেহ। সর্বদা তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলেন। কোনও অসুস্থ ছাত্র বা ছাত্রীকে আর্থিক সাহায্য করা, ঠিক সময় বেতন দিতে না পারার জন্য কোনও ছাত্রের নাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতা থেকে কাটা গেলে তাকে সাহায্য করা- এই সবই করে গিয়েছেন অক্লেশে। কোনও পড়ুয়ার বিবাহের প্রস্তাব হয়তো পরিবার-পরিজন গ্রহণ করছেন না, তাঁদের বুঝিয়েছেন। প্রকৃত ছাত্রদরদি এক শিক্ষক ছিলেন তিনি। শুধুমাত্র বিদ্যাদান নয়, ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষ করে তুলতে চাইতেন। তাঁদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতেন স্বদেশপ্রীতি, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ।
৮.
ছোট থেকেই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন ধার্মিক। তবে ক্লাসের হিন্দু সহপাঠীদের সাথে ছিল তার গলায় গলায় ভাব। ভাই গিরিশচন্দ্রের কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ ও তাপসমালা এবং মুহাম্মদ চরিত পড়ে ধর্মের প্রতিতার অনুরাগ গাঢ় হয়েছিল। নামাজ পড়ার অভ্যাস ছিল তার ছোট থেকেই। সব হিন্দু ছেলেদেরকে পেছনে ফেলে তিনি পরীক্ষায় প্রথম হলে সহপাঠীরা পন্ডিতকে খেপাবার জন্য বলে “স্যার, আমরা বামন-কায়েতের ছেলে থাকতে, আপনি ঐ মুসলমান ছেলেটাকে বরাবর ফার্স্ট করে দেন, এ আপনি অন্যায় করেন স্যার।” তাতে তিনি বলেন, আমি কি করব ও সিরাজুদ্দৌলা লেখে ভাল; তোরা তেমন লেখতে পারিস না।” পন্ডিত মশায় শহীদুল্লাহ নাম মনে রাখতে পারতেন না বলে তাকে সিরাজুদ্দৌলা বলে ডাকতেন। ফলে তাঁর জন্ম এক গোঁড়া মুসলমান পরিবারে হলেও তিনি নিজেও ছিলেন এক জন নিষ্ঠাবান মুসলমান। পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যাভাসে নিজ ধর্মের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে চাইতেন। কিন্তু তাতে কোনও সাম্প্রদায়িকতার স্থান ছিল না। কোরান অধ্যয়নে তাঁর যতটা আগ্রহ ছিল, ঠিক ততটাই উৎসাহ ছিল বেদ বা পালি সাহিত্য অধ্যয়নে।
৯.
ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব, বহুভাষাবিদ, বিশিষ্ট শিক্ষক ও দার্শনিক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হাওড়া জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা (১৯০৪) এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ (১৯০৬) পাস করার পর তিনি হুগলি কলেজে পড়াশোনা করেন (১৯০৬-৮)। কিন্তু অসুস্থতার কারণে অধ্যয়নে সাময়িক বিরতির পর তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ (১৯১০) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ (১৯১২) পাস করেন। দুবছর পর তিনি বি.এল (১৯১৪) ডিগ্রিও অর্জন করেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যশোর জেলা স্কুলের শিক্ষক (১৯০৮-০৯) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন; তারপর সীতাকুন্ড হাইস্কুলে কিছুদিন প্রধান শিক্ষকের (১৯১৪-১৯১৫) দায়িত্ব পালন করার পর তিনি চবিবশ পরগনা জেলার বশিরহাটে আইন ব্যবসায়ে (১৯১৫-১৯) নিযুক্ত হন। এখানে তিনি পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে শরৎচন্দ্র লাহিড়ী গবেষণা-সহকারী (১৯১৯-২১) হিসেবে কাজ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে (১৯২১) যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা তাঁর জীবনের সর্বাপেক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এখানে শিক্ষাদান কালে তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে মৌলিক গবেষণা করেন এবং ১৯২৫ সালে প্রমাণ করেন যে, গৌড়ী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে।
১০.
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৯২৬ সালে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ যান। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বৈদিক ভাষা, বৌদ্ধ সংস্কৃত, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব, তিববতি ও প্রাচীন পারসিক ভাষা এবং জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচীন খোতনি, প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক সংস্কৃত ও প্রাকৃত ভাষা শেখেন। ১৯২৮ সালে তিনি বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এ বছরই ধ্বনিতত্ত্বে মৌলিক গবেষণার জন্য তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমাও লাভ করেন এবং স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। অতঃপর সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ ভেঙ্গে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ হলে ১৯৩৭ সালে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হন এবং ১৯৪৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন।
১১.
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং বিভাগীয় প্রধান ও কলা অনুষদের ডীন হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ (১৯২২-২৫) ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে (ফরাসি ভাষার) খন্ডকালীন অধ্যাপক (১৯৫৩-৫৫) হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৫-৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ লাভ করেন।
১২.
অধ্যাপনার বাইরে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ করাচির উর্দু উন্নয়ন সংস্থার ‘উর্দু অভিধান প্রকল্প’, (১৯৫৯-৬০), ঢাকার বাংলা একাডেমীর ‘পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্প’ (১৯৬০) এবং ‘ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্প’-এ (১৯৬১-৬৪) সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক (১৯২১-২৫), ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট (১৯৪০-৪৪), ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য (১৯৬৩-৬৪), ইসলামিক একাডেমীর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য (১৯৬৩-৬৪), বাংলা একাডেমীর বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন।
১৩.
ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শহীদুল্লাহ্ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনিই প্রথম উর্দুর পরিবর্তে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিক দাবি জানান। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। বহু ভাষাবিদ, পণ্ডিত ও প্রাচ্যে অন্যতম সেরা ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি ও ধর্মপ্রাণ মুসলমান। জাতিসত্তা সম্পর্কে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র স্মরণীয় উক্তি ছিল, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি।’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরই দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে যে ক’জন ব্যক্তি জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর এই ভূমিকার ফলে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পথ অনেকখানিই প্রশস্ত হয়। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক (১৯১১) ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন (১৯১৭), ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজ সম্মেলন (১৯২৬), কলকাতায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মেলন (১৯২৮), হায়দ্রাবাদে নিখিল ভারত প্রাচ্যবিদ্যা সম্মেলন (ভাষাতত্ত্ব শাখা, ১৯৪১) এবং পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন (১৯৪৮)। মাদ্রাজে ‘ইন্টারন্যাশনাল সেমিনার অন ট্রাডিশনাল কালচার ইন সাউথ-ইস্ট এশিয়া’ অনুষ্ঠানে তিনি ইউনেস্কোর প্রতিনিধিত্ব করেন এবং তার চেয়ারম্যান মনোনীত হন।
১৪.
ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে শহীদুল্লাহ্ বহু মননশীল ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তিনি সম্পাদনা করেন। আল এসলাম পত্রিকার সহকারী সম্পাদক (১৯১৫) ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯১৮-২১) হিসেবে তিনি যোগ্যতার পরিচয় দেন। তাঁরই সম্পাদনা ও প্রকাশনায় মুসলিম বাংলার প্রথম শিশুপত্রিকা আঙুর (১৯২০) আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়াও তিনি ইংরেজি মাসিক পত্রিকা দি পীস (১৯২৩), বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গভূমি (১৯৩৭) এবং পাক্ষিক তকবীর (১৯৪৭) সম্পাদনা করেন।
১৫.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস রচনাসহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহু জটিল সমস্যার সমাধান করেন। বাংলা লোকসাহিত্যের প্রতিও তিনি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। গবেষণাগ্রন্থের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য এবং শিশুসাহিত্যের অনেক মৌলিক গ্রন্থও রচনা করেন। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ অনুবাদ ও সম্পাদনাও করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো: সিন্দবাদ সওদাগরের গল্প (১৯২২), ভাষা ও সাহিত্য (১৯৩১), বাঙ্গালা ব্যাকরণ (১৯৩৬), দীওয়ান-ই-হাফিজ (১৯৩৮), শিকওয়াহ ও জওয়াব-ই-শিকওয়াহ (১৯৪২), রুবাইয়াত-ই-উমর খয়্যাম (১৯৪২), Essays on Islam (১৯৪৫), আমাদের সমস্যা (১৯৪৯), পদ্মাবতী (১৯৫০), বাংলা সাহিত্যের কথা (২ খন্ড ১৯৫৩, ১৯৬৫), বিদ্যাপতি শতক (১৯৫৪), বাংলা আদব কী তারিখ (১৯৫৭), বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (১৯৫৭), বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৫৯), কুরআন শরীফ (১৯৬৩), অমরকাব্য (১৯৬৩), সেকালের রূপকথা (১৯৬৫) ইত্যাদি। তাঁর সম্পাদিত আঞ্চলিক ভাষার অভিধান এক বিশেষ কীর্তি। মুহম্মদ আবদুল হাই -এর সঙ্গে তাঁর যুগ্ম-সম্পাদনায় রচিত Traditional Culture in East Pakistan (১৯৬১) একখানা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর Buddhist Mystic Songs (১৯৬০) গ্রন্থটি চর্যাপদের অনুবাদ ও সম্পাদনা কর্ম। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে চর্যাপদ সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় রচিত; এর ধর্মতত্ত্ব নিয়েও তিনি আলোচনা করেন।
১৬.
মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন বহুভাষাবিদ এবং ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন। তিনি ১৮টি ভাষা জানতেন; ফলে বিভিন্ন ভাষায় সংরক্ষিত জ্ঞানভান্ডারে তিনি সহজেই প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান; তাঁর ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে ধর্ম সম্পর্কে তাঁর আন্তরিক বিশ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ইসলামের প্রকৃত তাৎপর্য তুলে ধরার জন্য গ্রামে-গঞ্জে ওয়াজ-মাহফিলে বক্তৃতা করতেন। জীবনভর ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান্স’, ফরাসি সরকার কর্তৃক ‘নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্ট লেটার্স’ (১৯৬৭) উপাধিতে ভূষিত হন।
১৭.
ভাল খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। মনে করতেন, স্বাস্থ্য ভাল না হলে পড়াশোনা কি গবেষণা-অধ্যাপনা, সবই বৃথা। তাই জীবন ধারণের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতেন। মাংস, বিশেষ করে গো-মাংসের প্রতি ছিল তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। ঢাকার যে অঞ্চলে বাড়ি করেছিলেন তার পাশেই ছিল কসাইপাড়া। কখনও যদি কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, এমন জায়গায় বাড়ি করলেন কেন? তার উত্তরে বলতেন, ‘‘স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য গোস্ত খাওয়ার প্রয়োজন। পাশেই কসাইপাড়া, হাত বাড়ালেই গোস্ত পাওয়া যায়।’’ এমনই রসিক মানুষ ছিলেন তিনি।
১৮.
তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৯১০ সালের ১০ অক্টোবর। হালকা চালে বলতেন, ‘‘আমার বিবাহের দিনটা মনে রাখা সহজ। টেন কিউব।’’ সারা জীবন গুরুগম্ভীর বিদ্যাচর্চা করলেও আসলে মানুষটি ছিলেন সহজ সরল মনের।
১৯.
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র অনেক মতামতই সবিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। তার গভীর তাৎপর্যময় বাণীও মনে দাগ কাটে। যেমনটি তিনি বলেছেন, “অনেকদিন পরে এখন ধুম পড়িয়া গিয়াছে ধর্ম প্রচারের, চারিদিকে দেখিতেছি কত তবলীগ সমিতি, কত ইশাআতে ইসলাম সমিতি। খালি কথা, কথা, কথা! কথায় জগৎ ভুলে না। জগৎ কাজ চায়। মরিবার পর স্বর্গের অনন্ত সুখের আশায় মানুষ পৃথিবীর নিত্য, নরক যন্ত্রণা ভুলিতে পারে না। ইসলাম প্রচার করিতে হইলে মানুষকে দুনিয়াতে বেহেস্তের আস্বাদ দেওয়াইতে হইবে। চারিদিকে ক্ষুধার্তের হাহাকার, পীড়িতের চিৎকার, দরিদ্রদের ক্রন্দন ও উৎপীড়িতের আর্তনাদ, এইখানেই ‘হাভিয়া দোজখ’, যে এই দোজখ নিবাইতে পারে সেই প্রকৃত ইসলাম প্রচার করিতে পারে।” (‘মুক্তির দিশারী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’, আ. জা. ম. তকীয়ূল্লাহ, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৭)
২০.
মাতৃভাষার প্রতি ছিল অবিচল ভক্তি। বাংলার প্রতি কোনও অবিচার তিনি সহ্য করতেন না। পূর্ব পাকিস্তানের উপর জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। এই নিয়ে কলম ধরতেও দ্বিধা করেননি। মাতৃভাষা আন্দোলনে নিজে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না করলেও ছাত্রসমাজকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। আন্দোলনের সময় নিজের কনিষ্ঠ পুত্রকে বলেছিলেন, ‘‘মাতৃভাষার জন্য যদি তোমার প্রাণ যেত, আমার কোনও দুঃখ থাকত না।’’ একেই তিনি সংস্কৃতের ছাত্র, তার উপর মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ। স্বাভাবিক ভাবেই দেশের সরকারের রোষে পড়েছিলেন। তিনি ‘হিন্দু ঘেঁষা’, এই তকমাও ছিদ্রান্বেষীরা দিতে দ্বিধা করেনি। দেশভাগের অনেক পরে ভারত সরকার তাঁকে একটি ফেলোশিপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘হিন্দু ঘেঁষা’ শহীদুল্লাহ্‌কে তাঁর দেশের সরকার এই ফেলোশিপ গ্রহণ করার অনুমতি দেয়নি।
২১.
বাঙালি জাতির ঐক্য মূলত ভাষাগত। ভাষা ও সাহিত্য (১৯৩১) গ্রন্থে শহীদুল্লাহ্ বলেছেন, ভাষা মানুষের সমাজের একটি ‘বাঁধন-দড়ি’। ধর্ম, রাজনীতি ছাড়া এ রকম আরও কিছু ‘বাঁধন-দড়ি’ আছে; কিন্তু সবগুলোর গোড়ার কথা এই ভাষা। আর তাই তো দেখি, ১৯৪৮ সালে, পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন আদর্শের প্রশ্নে একরকম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বললেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ একই সঙ্গে যুক্ত করলেন, ‘এটি কোনো আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব সত্য। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-দাড়িতে ঢাকবার জো-টি নেই।’
২২.
প্রায় একটি শতাব্দির সূর্যালোক স্পর্শকারী এই প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের গর্ব ও অহঙ্কার। ‘জ্ঞানতাপস’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ৮৪ বছর বয়সে ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পাশে সমাহিত করা হয়। ভাষাক্ষেত্রে তাঁর অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ঐ বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় শহীদুল্লাহ হল। এছাড়াও তাঁর নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কলা ভবনের নামকরণ করা হয়।

(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, কালি ও কলম, দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক প্রথম আলো, ইন্টারনেট)

আবদুল্লাহ আল মোহন
১০ জুলাই, ২০১৫ / ১০ জুলাই, ২০১৬/ ১০ জুলাই, ২০১৭/ ১০ জুলাই, ২০১৮/ ১০ জুলাই, ২০১৯

শেয়ার করতে এখানে চাপ দিন

সর্বশেষ খবর